নিজেদের প্রধান তেল বন্দরগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশটি এবার শিশুসৈনিক নিয়োগের গণ-উদ্যোগ নিয়েছে। যা ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মেরিন ও এয়ারবোর্ন সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও তিনি সরাসরি স্থল অভিযানের কথা বলেননি, তবে এই মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের দ্বীপগুলোতে অভিযান চালানোর পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরানও তাদের সমুদ্রসীমায় মাইন স্থাপন এবং উপকূলীয় এলাকায় ফাঁদ তৈরির মতো কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।
ইরানের পার্লামেন্টের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি জানান, দেশটির প্রধান তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন দ্বীপে ইরান অসংখ্য সুড়ঙ্গ খনন করেছে, যেখান থেকে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে মার্কিন সেনাদের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউজের পরিচালক সানাম ওয়াকিল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনও অবতরণকে যতটা সম্ভব ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করে তোলাই ইরানের লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হাতে প্রায় ১০ লাখ সক্রিয় ও রিজার্ভ সেনা রয়েছে, যার মধ্যে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ১ লাখ ৯০ হাজার সদস্য অত্যন্ত দুর্ধর্ষ।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, আইআরজিসি এবার ১২ বছর বয়সী শিশুদেরও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে। ‘জানফাদা’ বা ‘উৎসর্গ’ নামক এক অভিযানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ডিফা প্রেসের প্রকাশিত এক নিয়োগ পোস্টারে হাসিমুখে এক কিশোর ও হিজাব পরা এক কিশোরীকে দেখা গেছে। যদিও তারা রান্নাবান্না বা চিকিৎসার মতো সহায়তামূলক কাজের কথা বলছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকালে শিশু নিহতের খবরও পাওয়া গেছে।
আইআরজিসির সংস্কৃতি ও শিল্প বিষয়ক উপপরিচালক রহিম নাদালি বলেন, মাতৃভূমি রক্ষায় সব আগ্রহী পক্ষ যাতে ভূমিকা রাখতে পারে, সেই পরিবেশ আমরা তৈরি করছি।
আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা ফার্স-এর দাবি, ইতোমধ্যে লাখ লাখ মানুষ এই অভিযানে সাড়া দিয়েছে।
তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তাদের ওপর হামলা হলে তার চড়া মূল্য দিতে হবে পুরো অঞ্চলকে। ইরান ও আরব কর্মকর্তাদের মতে, তেহরান তার প্রতিবেশীদের সতর্ক করেছে যে তাদের দ্বীপে আক্রমণ হলে তারা অফশোর তেল প্ল্যাটফর্ম, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পানি শোধনকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত হানবে।
সাবেক ব্রিটিশ নৌ কর্মকর্তা ক্রিস লং জানান, ইরান তাদের কেশম দ্বীপ বা বুশেহর বন্দর থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। অন্যদিকে, সাবেক রুশ সামরিক কর্মকর্তা গ্লেব ইরিসভ সতর্ক করে বলেছেন, পুরো উপকূলরেখা রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের ১ লাখেরও বেশি সেনার প্রয়োজন হবে, অন্যথায় বিপুল সংখ্যক আমেরিকান সেনা হতাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
যুদ্ধ নিয়ে ইরানের জনগণের মধ্যে বিভক্তি থাকলেও বিদেশি আগ্রাসন বা ভূখণ্ড দখলের হুমকির মুখে অনেকেই একজোট হচ্ছেন। বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ইরান ছাড়া অ্যাক্টিভিস্ট আজম জাংরাভি বলেন, শুরুতে আমি শীর্ষ নেতাদের ওপর হামলার পক্ষে থাকলেও ট্রাম্প যখন দ্বীপ দখলের হুমকি দিলেন, তখন আমার মত বদলে গেছে। শাসনব্যবস্থার সমর্থক হোক বা বিরোধী, আঞ্চলিক অখণ্ডতা বেশিরভাগ ইরানির কাছেই ‘রেড লাইন’।”