চট্টগ্রামের ভোজ্যতেলের বাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকট ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘তেলেসমাতি’। পাইকারি থেকে খুচরা সব স্তরেই দামের ভিন্নতা, সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং সিন্ডিকেটের অভিযোগে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে সয়াবিন ও পাম তেলের দামে লিটারপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। একই এলাকায় একেক দোকানে একেক দাম যা ভোক্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। নগরের কর্ণফুলী, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি পর্যায় থেকেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, ফলে তারা বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কতিপয় ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করে আসছেন। বারবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও সরকারি হস্তক্ষেপে দাম বাড়াতে পারেননি।
এবার নানা অজুহাতে সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েছে সয়াবিনের বাজার। ফলে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর। বিক্রেতাদের দাবি, মিলগেট পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণেই খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাতে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে পাইকারি বাজারে দাম বাড়তেই খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
আর বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, সরবরাহে ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটের তৎপরতা সব মিলিয়েই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এদিকে প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চাহিদা মতো সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না খুচরা ব্যবসায়ীরা। কোনো কোনো কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেল নিতে মানতে হচ্ছে অন্য পণ্য নেওয়ার শর্ত। তেল নিয়ে এমন তেলেসমাতির সুযোগে ক্রেতা পড়েছেন বিপাকে। কেউ কিনছেন চাহিদার অতিরিক্ত তেল, কেউ আবার সয়াবিন তেলের জন্য দোকানে দোকানে ঘুরছেন।
অন্যদিকে বাজার বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, সরবরাহে প্রকৃত সংকটের চেয়ে সিন্ডিকেটের তৎপরতাই বেশি প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, বাজারে দাম বাড়লে দ্রুত তার প্রভাব পড়ে খুচরা পর্যায়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যেন কেউ অযৌক্তিকভাবে দাম না বাড়াতে পারে, সে জন্য বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
যদিও গত মাসেই বাণিজ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, দেশে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বাস্তব বাজার পরিস্থিতি তার বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে। ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতার বিষয়ে কথা বলেন ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন।
তিনি জানিয়েছেন, ভোজ্যতেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বাস্তবে কোনো ঘাটতি নেই। দীর্ঘদিন ধরেই কিছু ব্যবসায়ী বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছিলেন, আর বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তারা সেই সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তার মতে, দেশে ভোজ্যতেলের দাম বাড়লে দ্রুতই তার প্রভাব সব পর্যায়ের বাজারে পড়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সাধারণ ভোক্তা সেই সুফল খুব কমই পান।
খুচরা ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা বেশি দামে তেল কিনে থাকলে বেশি দামে বিক্রি করাটা স্বাভাবিক। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের কাছে ক্রয়ের রশিদ বা ভাউচার থাকা জরুরি। চট্টগ্রামের ভোজ্যতেলের বাজারে চলমান অস্থিরতা কেবল একটি পণ্যের সংকট নয়, বরং এটি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে এমন আশঙ্কাই এখন সর্বত্র।