আজ ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। জাতি যখন দেশজুড়ে বীর শহীদদের আত্মত্যাগের মহিমা স্মরণ করছে, ঠিক সেই পবিত্র দিনে শরীয়তপুরে ঘটল এক হৃদয়বিদারক ও নজিরবিহীন ঘটনা। একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান খানের কবরে অগ্নিসংযোগ করেছে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) গভীর রাতে সদর উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের নিয়ামতপুর গ্রামে এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। বিজয়ের মাসে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ শয্যার এমন অবমাননায় স্তম্ভিত নিহতের পরিবার, ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয় ‘Civil Society’ ও সাধারণ মানুষ।
রাতের আঁধারে জঘন্য অবমাননা
স্থানীয় সূত্র ও নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান খান ১৯৭১ সালের মহান ‘Liberation War’-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ২০১০ সালে মৃত্যুবরণের পর পারিবারিক কবরস্থানে, নিজ বসতঘরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, সোমবার গভীর রাতের কোনো এক সময়ে দুর্বৃত্তরা কবরের ওপর পাটখড়ি ও কাঠ জড়ো করে পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের লেলিহান শিখা কবরের উপরিভাগ গ্রাস করে ফেলে এবং দুর্বৃত্তরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
ভোরের আলোয় পোড়া ছাই আর কান্না
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে আজ মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) সকালে। স্বামীর কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পোড়া ছাই ও আগুনের ধ্বংসাবশেষ নজরে আসে নিহতের স্ত্রী মাহফুজা বেগমের। কবরের মাটি তখনও গরম ছিল এবং পোড়া ছাই থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছিল।
এই দৃশ্য দেখে মাহফুজা বেগমের আর্তনাদে পরিবারের অন্য সদস্যরা ছুটে আসেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, “আমার স্বামী দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। মৃত্যুর পরও তার শান্তি নেই? কবরের সঙ্গে এমন শত্রুতা মানুষ কীভাবে করতে পারে? বিজয়ের মাসে এমন আঘাত আমরা মেনে নিতে পারছি না। আমি এর ন্যায়বিচার চাই।”
বাবার কবরের এমন করুণ দশা দেখে শোকে পাথর হয়ে গেছেন মেয়ে আফরোজা আক্তার। তিনি বলেন, “মায়ের চিৎকার শুনে দৌড়ে এসে দেখি বাবার কবরের একাংশ পুড়ে ছাই। কারা, কী উদ্দেশ্যে এমন ‘Heinous Act’ বা জঘন্য কাজ করেছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা পুরো পরিবার চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
প্রশাসনের তৎপরতা ও তদন্তের আশ্বাস
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল বা ‘Spot’ পরিদর্শন করেন। পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, “কবরে আগুন দেয়া আর জীবন্ত মানুষের গায়ে আগুন দেয়া—অনুভূতির জায়গায় একই কথা। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। কে বা কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা খুঁজে বের করতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ‘Investigation’ শুরু করেছে।”
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম জানিয়েছেন, বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে লোক পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রশাসন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক আব্দুল জলিল সিকদার এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কবরের অবমাননা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তারা বিষয়টি নিয়ে জরুরি আলোচনা করছেন এবং প্রয়োজনে কঠোর কর্মসূচির ডাক দেবেন।
বিজয়ের দিনে এমন ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়রা অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।