দেশের সীমান্ত জেলা যশোরে এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে ভয়ংকর সিন্থেটিক মাদক ‘ক্রিস্টাল আইস’ বা মেথামফেটামিন তৈরির বিপুল পরিমাণ কাঁচামালসহ এক তরুণীকে আটক করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (DB)। গত বৃহস্পতিবার রাতে যশোর শহরের ব্যস্ততম মণিহার এলাকায় একটি দূরপাল্লার বাস থেকে তাকে আটক করা হয়। উদ্ধারকৃত রাসায়নিকের পরিচয় নিশ্চিত হতে পুলিশকে দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।
মণিহার বাসস্ট্যান্ডে আকস্মিক হানা
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যশোর ডিবির এসআই অলোক কুমার দের নেতৃত্বে একটি চৌকস দল জানতে পারে, সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রামগামী ‘ঈগল পরিবহনের’ একটি বাসে অবৈধ মাদকদ্রব্যের বড় একটি চালান পরিবহন করা হচ্ছে। রাত সাড়ে ৮টার দিকে মণিহার বাসস্ট্যান্ডে নির্দিষ্ট বাসটি পৌঁছালে পুলিশ তল্লাশি শুরু করে। বাসের মালামাল রাখার বক্স থেকে একটি প্লাস্টিকের বস্তার ভেতর তিনটি সন্দেহজনক প্যাকেট পাওয়া যায়। ওই মালামালের মালিক হিসেবে শাপলা খাতুন স্বপ্না (২৮) নামক এক তরুণীকে আটক করা হয়। স্বপ্না সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আখড়াখোলা গ্রামের আক্তারুজ্জামানের মেয়ে।
১৮ ঘণ্টার ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ ও ল্যাব টেস্টের তোড়জোড়
আটকের পর প্রাথমিকভাবে উদ্ধারকৃত সাদা পাউডার জাতীয় দ্রব্যটির পরিচয় নিশ্চিত হতে পারছিল না পুলিশ। স্বপ্নাও শুরুতে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন এবং মুখ খুলতে রাজি হননি। এরপর তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে দীর্ঘ ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। উদ্ধারকৃত দ্রব্যগুলো কোনো রাসায়নিক উপাদান কিনা তা নিশ্চিত করতে ‘Lab Test’ করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। টানা ১৮ ঘণ্টার নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে ভেঙে পড়েন স্বপ্না। তিনি স্বীকার করেন যে, বস্তার ভেতর থাকা ২৫টি ছোট প্যাকেটে মোট ২৫ কেজি এফিড্রিন (Ephedrine) বা সিউডোএফিড্রিন এবং ৬ লিটার পিউরিফাইড হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (Hydrochloric Acid) রয়েছে।
স্মার্টফোনের প্রলোভন ও ভয়ংকর সিন্ডিকেট
জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না জানান, এই বিশাল চালানটি চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড়ে জনৈক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তার। এই ‘High Risk’ কাজের বিনিময়ে তাকে নগদ কোনো টাকা নয়, বরং ৬০ হাজার টাকা মূল্যের একটি দামী স্মার্টফোন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল মূল কারবারি আজমল হোসেন লাল্টু। লাল্টু সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বাসিন্দা। মূলত ‘Carrier’ হিসেবে কাজ করা এই তরুণীকে ব্যবহার করে পর্দার আড়াল থেকে Drug Syndicate পরিচালনা করছিল লাল্টু।
ক্রিস্টাল আইস: এক প্রাণঘাতী আসক্তি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এফিড্রিন এবং হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড হলো ‘Crystal Ice’ বা ‘Ice’ তৈরির প্রধান Raw Materials। এই সিন্থেটিক মাদক অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর। সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে আসা এসব রাসায়নিক দিয়ে গোপন ল্যাবে মাদক তৈরি করে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি বড় চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
আইনি পদক্ষেপ ও পরবর্তী তদন্ত
এসআই অলোক কুমার দে জানান, এই ঘটনায় শাপলা খাতুন স্বপ্না ও পলাতক আজমল হোসেন লাল্টুর বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে স্বপ্নাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই মাদক পাচার চক্রের শিকড় কতদূর এবং চট্টগ্রামে এই মালামাল কার গ্রহণ করার কথা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে ডিবি।