বর্তমান কর্মব্যস্ত জীবনে মাথা ব্যথা যেন এক অতি পরিচিত উপসর্গ। তবে সব মাথা ব্যথা এক নয়। এর মধ্যে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক ও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হলো ‘মাইগ্রেন’ (Migraine)। মাইগ্রেনের ব্যথায় ভোগেননি এমন মানুষ আধুনিক বিশ্বে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই তীব্র যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে প্রয়োজন সঠিক সচেতনতা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ।
মাইগ্রেনের ব্যথা উপশম ও এটি প্রতিরোধের উপায় নিয়ে বিশেষ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন দেশের খ্যাতনামা নিউরোসার্জন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (BSMMU) নিউরোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রকিবুল ইসলাম রকিব।
মাইগ্রেনের তীব্র আক্রমণে তাৎক্ষণিক করণীয়
যখন মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হয়, তখন তা অসহ্য পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এই অবস্থায় দ্রুত আরাম পেতে ডা. রকিবুল ইসলাম নিচের দুটি পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন:
১. নিস্তব্ধ ও অন্ধকার ঘরে বিশ্রাম: মাইগ্রেনের রোগীরা সাধারণত আলো ও শব্দের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল (Photosensitivity and Phonophobia) হয়ে থাকেন। তাই ব্যথা শুরু হওয়া মাত্রই ঘরের আলো নিভিয়ে কোনো নিরিবিলি রুমে বিশ্রাম নিলে ব্যথার তীব্রতা দ্রুত কমতে শুরু করে। ২. বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ওষুধ সেবন: ব্যথা সহ্যের বাইরে চলে গেলে ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর না করে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ‘Painkiller’ বা ব্যথা উপশমকারী ওষুধ সেবন করা উচিত।
দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষায় জীবনযাত্রার পরিবর্তন (Lifestyle Modification)
মাইগ্রেন পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন হলেও জীবনযাত্রায় কিছু শৃঙ্খলা আনলে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ডা. রকিবুল ইসলামের পরামর্শগুলো হলো:
পরিমিত ঘুম: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন। অনিয়মিত ঘুম বা অতিরিক্ত রাত জাগা মাইগ্রেনের অন্যতম প্রধান ‘Trigger’।
খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা: দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকা বা বেলা করে খাবার খাওয়া মাইগ্রেনের রোগীদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই সময়মতো পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
পর্যাপ্ত জলপান: শরীরের আর্দ্রতা বা ‘Hydration’ বজায় রাখা মাইগ্রেন রোধে দারুণ কার্যকর। দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করার অভ্যাস করুন।
মানসিক প্রশান্তি: নিয়মিত মেডিটেশন (Meditation) বা ইয়োগা (Yoga) করলে স্নায়বিক উত্তেজনা প্রশমিত হয়, যা মাইগ্রেনের আক্রমণ কমিয়ে আনে।
যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
কিছু নির্দিষ্ট খাবার ও পানীয় মাইগ্রেনের ব্যথাকে উসকে দিতে পারে। ডা. রকিবুলের মতে, ডায়েট চার্ট থেকে নিচের খাবারগুলো বাদ দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়: ১. অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় যেমন কফি ও কোকা-কোলা। ২. ডার্ক চকোলেট ও অ্যালকোহল। ৩. প্রসেসড ফুড বা অতিরিক্ত টেস্টিং সল্টযুক্ত খাবার।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও চিকিৎসা
ডা. রকিবুল ইসলাম রকিব একজন অভিজ্ঞ মাইক্রোসকপিক ও এন্ডোসকপিক নিউরোসার্জন (Microscopic and Endoscopic Neurosurgeon)। তিনি জানান, যারা দীর্ঘস্থায়ী মাইগ্রেনের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ‘Prophylactic’ বা প্রতিরোধক ওষুধ সেবন করা জরুরি হতে পারে। কোনোভাবেই ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ওষুধ কিনে সেবন করা উচিত নয়, কারণ এতে কিডনিসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনই পারে মাইগ্রেনের মতো জটিল সমস্যাকে জয় করতে।