রমজান মাসে আমাদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে সেহরির জন্য শেষ রাতে ঘুম থেকে ওঠা এবং দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকার ফলে শরীরে কিছুটা ক্লান্তি বা অবসাদ আসা স্বাভাবিক। এই ক্লান্তি দূর করতে অনেকেই দুপুরে কিছুটা সময় ঘুমিয়ে নিতে পছন্দ করেন। তবে রোজা রেখে দুপুরে ঘুমানো কি আদতে স্বাস্থ্যকর? আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং পুষ্টিবিদদের মতে, রমজানে দুপুরের পরিমিত ঘুম কেবল ক্লান্তিই দূর করে না, বরং এটি শরীর ও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে ‘জাদুকরী’ ভূমিকা পালন করে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা।
ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করতে ‘পাওয়ার ন্যাপ’ (Power Nap) রমজানে ঘুমের চক্র বা ‘Sleep Cycle’ পরিবর্তন হওয়ার কারণে দিনের বেলা শরীরে শক্তির মাত্রা বা ‘Energy Level’ কমে যেতে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুরে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের একটি ছোট ঘুম বা ‘Power Nap’ শরীরকে দ্রুত রিচার্জ করতে সাহায্য করে। এটি স্নায়বিক চাপ কমিয়ে মনকে শান্ত রাখে এবং বিকেলের দিকে ইফতারের আগ পর্যন্ত শরীরকে সচল রাখার প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়।
মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও মনোযোগ (Focus) বৃদ্ধি দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে মস্তিষ্কে গ্লুকোজের সরবরাহ কিছুটা কমে যায়, যার ফলে অনেক সময় কাজে মনোযোগ দিতে সমস্যা হয় বা ‘ঝিমুনি’ আসে। দুপুরের স্বল্পস্থায়ী বিশ্রাম মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সতেজ করে এবং ‘Alertness’ বা সতর্কতা বৃদ্ধি করে। যারা দাপ্তরিক কাজ বা পড়াশোনা করেন, তাদের জন্য এই ‘পাওয়ার ন্যাপ’ সৃজনশীলতা এবং কাজের দক্ষতা ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত কার্যকর।
মাথাব্যথা ও মেটাবলিজম (Metabolism) নিয়ন্ত্রণ রোজার সময় পানিশূন্যতা বা ঘুমের অভাবে অনেকেরই প্রচণ্ড মাথাব্যথা হতে পারে। দুপুরে অল্প সময় চোখ বুজে বিশ্রাম নিলে শরীরের ‘Metabolism’ স্থিতিশীল থাকে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এটি শারীরিক অস্বস্তি কমিয়ে শরীরকে শিথিল বা ‘Relax’ করে।
কতক্ষণ ঘুমানো আদর্শ? দুপুরের ঘুমের ক্ষেত্রে সময়ের দিকে খেয়াল রাখা সবচেয়ে জরুরি। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী:
১৫–৩০ মিনিট: এটিই সবচেয়ে আদর্শ সময়। এতে শরীর সতেজ হয় কিন্তু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয় না।
১ ঘণ্টার বেশি নয়: এক ঘণ্টার বেশি ঘুমালে শরীরে ‘Sleep Inertia’ বা জড়তা তৈরি হতে পারে। এর ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর আরও বেশি ক্লান্ত এবং অলস লাগতে পারে।
কখন ঘুমানো উচিত নয়? বিকেলের দিকে বা ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে ঘুমানো একদমই উচিত নয়। এই সময়ে ঘুমালে রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে এবং ইফতারের পর হজম প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই জোহরের নামাজের পর থেকে আসরের আগের সময়টি দুপুরের বিশ্রামের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
পরিশেষ রোজা রেখে দুপুরে ঘুমানো কেবল আরামদায়কই নয়, এটি একটি বিজ্ঞানসম্মত স্বাস্থ্যকর অভ্যাস যদি তা নিয়ম মেনে করা হয়। তবে মনে রাখতে হবে, এই ঘুম যেন রাতের দীর্ঘ ঘুমের বিকল্প না হয়। শরীরকে সতেজ রাখতে এবং রমজানের দিনগুলোকে আরও প্রাণবন্ত করতে দুপুরের এই ‘পাওয়ার ন্যাপ’ আপনার জন্য হতে পারে দারুণ এক ‘এনার্জি বুস্টার’।