• জীবনযাপন
  • ঢাকার আইসিইউতে নিরাময় অযোগ্য ‘সুপারবাগ’ ক্যানডিডা অরিস: আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য

ঢাকার আইসিইউতে নিরাময় অযোগ্য ‘সুপারবাগ’ ক্যানডিডা অরিস: আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য

জীবনযাপন ১ মিনিট পড়া
ঢাকার আইসিইউতে নিরাময় অযোগ্য ‘সুপারবাগ’ ক্যানডিডা অরিস: আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য

সাধারণ অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধে মরছে না এই ছত্রাক; সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার ১৩ শতাংশ—তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকিতে গুরুতর অসুস্থ রোগীরা।

ঢাকার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটগুলোতে (ICU) নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ছে এক ভয়ংকর ঘাতক ছত্রাক, যার নাম ‘ক্যানডিডা অরিস’ (Candida auris)। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddr,b)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র। গবেষণায় দেখা গেছে, তথাকথিত এই ‘সুপারবাগ’ (Superbug) কেবল নবজাতকদের আইসিইউ (NICU) নয়, বরং গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যেও সংক্রমণ ঘটাচ্ছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষণার প্রেক্ষাপট ও ব্যাপ্তি

‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’ (Microbiology Spectrum) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাটি ঢাকার একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে পরিচালিত হয়। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (CDC) কারিগরি সহায়তায় ২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অনুসন্ধান চালানো হয়। গবেষণায় ৩৭২ জন রোগীকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

সংক্রমণের হার ও হাসপাতালের চিত্র

গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন প্রায় ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে ‘ক্যানডিডা অরিস’ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আশঙ্কার কথা হলো, আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর এই ছত্রাক দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন। অর্থাৎ, হাসপাতালের পরিবেশ থেকেই এই রোগ ছড়াচ্ছে (Hospital-acquired infection)।

সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সংক্রমণের হারে বড় পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে এই হার ১৩ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে এটি মাত্র ৪ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এই চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ; কানাডা বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে এই সংক্রমণের হার সাধারণত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের নিচে থাকে।

কেন এই ছত্রাক এত বিপজ্জনক?

ক্যানডিডা অরিস মূলত একটি ‘ওষুধ-প্রতিরোধী’ (Drug-resistant) ছত্রাক। এটি অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই রোগীর ত্বকে অবস্থান করতে পারে (Colonization)। তবে যখন এটি রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে, তখন মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। বিশেষ করে যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং যারা ‘ইনভেসিভ’ (Invasive) চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন—মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন (Mechanical Ventilation), সেন্ট্রাল ক্যাথেটার বা ইউরিনারি ক্যাথেটারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

ব্যর্থ হচ্ছে প্রচলিত ওষুধ

ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, আইসিইউ থেকে সংগৃহীত সি. অরিসের সবকটি নমুনা ‘ফ্লুকোনাজল’ (Fluconazole) নামক সাধারণ অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে পুরোপুরি প্রতিরোধী। এছাড়া প্রায় সব নমুনাই ‘ভরিকোনাজল’ (Voriconazole)-এর বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। অর্থাৎ, বাজারে প্রচলিত প্রথম ও দ্বিতীয় সারির অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ দিয়ে এই ছত্রাক ধ্বংস করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো নমুনা একাধিক ওষুধের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে (Multi-drug resistance)।

বিশেষজ্ঞের সতর্কতা

আইসিডিডিআর,বি-এর ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের এএমআর (AMR) রিসার্চ ইউনিটের প্রধান এবং প্রধান গবেষক ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, “এই গবেষণা প্রমাণ করছে যে ক্যানডিডা অরিস এখন আর নির্দিষ্ট কোনো ইউনিটে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পুরো আইসিইউ পরিবেশের জন্যই এক বিশাল হুমকি। আমরা হাসপাতালের ভেতরেই এর ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পেয়েছি। প্রচলিত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের উচ্চমাত্রার অকার্যকারিতা চিকিৎসাকে আরও কঠিন করে তুলছে।”

গবেষণার জিনগত বিশ্লেষণে (Genetic Analysis) দেখা গেছে, এই জীবাণুটি মূলত দক্ষিণ এশীয় ঘরানার। এর অর্থ হলো, এই ঘাতক ছত্রাক এখন আমাদের অঞ্চলেই স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে এবং দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।

প্রতিরোধের উপায় ও সুপারিশ

এই ‘সুপারবাগ’ রুখতে গবেষকরা বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করেছেন: ১. হাসপাতালের প্রতিটি অংশ নিয়মিত ক্লোরিনভিত্তিক শক্তিশালী জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা। ২. স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ হাত ধোয়া ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ৩. উচ্চঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের নিয়মিত স্ক্রিনিং (Screening) করা যাতে আক্রান্তদের দ্রুত আলাদা করা যায়। ৪. অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের যৌক্তিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।

গবেষকরা মনে করছেন, ঢাকার বাইরে সারা দেশে এই ছত্রাক কতটুকু ছড়িয়েছে তা জানতে আরও বড় পরিসরে নজরদারি এবং গবেষণা প্রয়োজন। অন্যথায়, আইসিইউতে থাকা রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি কমানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

Tags: public health fungal infection healthcare bangladesh candida auris superbug dhaka icu infection icddrb research drug resistance amr hospital safety