মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার লড়াইয়ে নতুন এক বিতর্কের জন্ম নিল। পাকিস্তানের ব্যাটিং ইনিংসের ৩৯তম ওভারে মেহদী হাসান মিরাজের করা একটি ‘রানআউট’ (Run-out) ঘিরে মাঠের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সাজঘরে ফেরার আগে পাকিস্তানি ব্যাটার সালমান আলী আগার শরীরী ভাষা এবং বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের সঙ্গে তার বাক্যবিনিময় এখন ক্রিকেট বিশ্বের নতুন আলোচনার বিষয়। ‘ক্রিকেটীয় চেতনা’ (Spirit of Cricket) নাকি ‘খেলার নিয়ম’—কোনটি বড়, সেই চিরন্তন বিতর্ক আবার সামনে নিয়ে এল এই ঘটনা।
৩৯তম ওভারের সেই নাটকীয় মুহূর্ত
ঘটনাটি ঘটে পাকিস্তানের ইনিংসের ৩৯তম ওভারে। তখন সালমান আগা এবং মোহাম্মদ রিজওয়ানের শতাধিক রানের পার্টনারশিপে পাকিস্তান একটি পাহাড়সম সংগ্রহের দিকে এগোচ্ছিল। মিরাজ তার শেষ ওভারের চতুর্থ বলটি করেন একটি নিখুঁত ‘Length Ball’। অন্য প্রান্তে থাকা রিজওয়ান বলটি আলতো করে ঠেলে দেন সালমানের দিকে। বোলার মিরাজ নিজের ডানে ক্ষিপ্র গতিতে সরে গিয়ে পা দিয়ে বলটি থামান, যা গিয়ে লাগে সালমানের প্যাডে।
ঠিক এই মুহূর্তেই ঘটে অঘটন। সালমান আগা বলটিকে ‘Dead Ball’ ভেবে নিয়ে ক্রিজের বাইরে থাকা অবস্থায় কুড়িয়ে নিয়ে মিরাজকে দিতে যান। কিন্তু বল তখনও টেকনিক্যালি সজীব ছিল। মিরাজ সুযোগটি হাতছাড়া না করে সালমানের হাত থেকে বল নেওয়ার বদলে তা দ্রুত স্টাম্পে লাগিয়ে দেন এবং ‘আন্ডার আর্ম থ্রো’ (Under-arm throw) করে আউটের আবেদন জানান।
মাঠেই মেজাজ হারালেন সালমান
ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে যান সালমান। তিনি মিরাজকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, তিনি স্রেফ বলটি কুড়িয়ে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিরাজ তার আপিলে অটল থাকেন। অন-ফিল্ড আম্পায়ার বিষয়টি ‘Third Umpire’-এর কাছে পাঠান। রিপ্লেতে দেখা যায়, বল যখন স্টাম্পে আঘাত করে, তখন সালমান ক্রিজের বাইরে ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী তৃতীয় আম্পায়ার তাকে আউটের ঘোষণা দেন।
সিদ্ধান্তটি মেনে নিতে না পেরে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন সালমান আগা। মাঠেই ব্যাট ও গ্লাভস ছুঁড়ে মেরে তিনি নিজের উষ্মা প্রকাশ করেন। প্যাভিলিয়নের দিকে যাওয়ার সময় বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের দিকে লক্ষ্য করে কিছু কটু মন্তব্য করেন তিনি, যাতে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। সালমানের মন্তব্য শুনে মেজাজ হারান লিটন দাসও। শেষ পর্যন্ত রিজওয়ান এবং আম্পায়ারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
চেতনার লড়াই বনাম পেশাদারিত্ব
এই আউটটি নিয়ে ক্রিকেট বিশ্লেষক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। এক পক্ষের মতে, সালমান আগা ক্রিকেটীয় সৌজন্য দেখাতে গিয়ে মিরাজকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, তাই এই আউটটি ‘Spirit of Cricket’-এর পরিপন্থী। অন্য পক্ষ মনে করছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনো বল ‘Dead’ হওয়ার আগে ক্রিজ ত্যাগ করা এবং বল হাতে নেওয়া এক ধরণের অপেশাদারিত্ব। মিরাজ স্রেফ নিয়মের মধ্যে থেকেই নিজের দলের জন্য ব্রেক-থ্রু নিশ্চিত করেছেন।
ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই ‘টার্নিং পয়েন্ট’
সালমানের এই ১০৯ রানের জুটি ভাঙার পরই খেলার মোড় ঘুরে যায়। দলীয় ২৩১ রানে আউট হওয়ার সময় পাকিস্তান বড় সংগ্রহের পথে থাকলেও, শেষ ৭টি উইকেট হারায় মাত্র ৪৩ রানের ব্যবধানে। মিরাজের সেই ‘বিতর্কিত’ আউটটিই যে পাকিস্তানের ‘Batting Collapse’-এর মূল কারণ ছিল, তা বলাই বাহুল্য। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ২৭৪ রানে অলআউট হয়ে যায়, যা বাংলাদেশের জয়ের পথকে কিছুটা সহজ করে দেয়।
ক্রিকেটের মাঠে এমন বিতর্কিত আউট আগেও অনেক দেখা গেছে, তবে মিরপুরের এই ঘটনা আরও একবার মনে করিয়ে দিল যে, বাইশ গজের লড়াইয়ে আবেগের চেয়ে নিয়মের গুরুত্বই বেশি।