• আন্তর্জাতিক
  • জ্বালানি সংকটে টালমাটাল ইউরোপ: হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের ‘সেফ প্যাসেজ’ নিশ্চিত করতে ইরানের দ্বারস্থ ফ্রান্স ও ইতালি

জ্বালানি সংকটে টালমাটাল ইউরোপ: হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের ‘সেফ প্যাসেজ’ নিশ্চিত করতে ইরানের দ্বারস্থ ফ্রান্স ও ইতালি

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
জ্বালানি সংকটে টালমাটাল ইউরোপ: হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের ‘সেফ প্যাসেজ’ নিশ্চিত করতে ইরানের দ্বারস্থ ফ্রান্স ও ইতালি

লোহিত সাগরের পর এবার হরমুজেও বিপাকে বাণিজ্যিক জাহাজ; তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ানোয় নড়েচড়ে বসেছে ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো, আলোচনার টেবিলে তেহরান।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) ক্রমবর্ধমান উত্তজনা ও জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থা নিরসনে এবার সরাসরি ইরানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসেছে ইউরোপের দুই শীর্ষ শক্তি ফ্রান্স ও ইতালি। মূলত লোহিত সাগরের অস্থিরতার পর হরমুজ প্রণালীর ওপর দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’ (Financial Times)-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ধাক্কা

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাতের আজ ১৪তম দিন। যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইউরোপের সাধারণ মানুষের পকেটে। বছরের শুরুতে যেখানে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল প্রায় ৬০ ডলার, বর্তমানে তা ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। একইসঙ্গে ইউরোপীয় বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের (Natural Gas) দাম বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনির কঠোর হুঁশিয়ারি এবং হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে অবরোধের আশঙ্কায় গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন (Global Supply Chain) কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্পোন্নত দেশগুলোর উৎপাদন খরচ ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা ফ্রান্স ও ইতালির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরোপীয় কূটনীতি ও ‘সেফ প্যাসেজ’ নিশ্চিতের চেষ্টা

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)ভুক্ত দেশগুলো ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, যাতে অন্তত জ্বালানি বহনকারী জাহাজগুলো কোনো হামলা ছাড়াই হরমুজ পার হতে পারে। ফরাসি ও ইতালীয় কূটনীতিকরা তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি ‘Safe Passage’ বা নিরাপদ করিডোর তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হলো—উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে জ্বালানি রফতানি পুনরায় শুরু করা এবং সামরিক উত্তেজনা এড়িয়ে চলা। তবে তেহরান এই প্রস্তাবে কতটা ইতিবাচক সাড়া দেবে, তা নিয়ে এখনও যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।

অনিশ্চয়তার মুখে ‘ইইউ অ্যাসপাইডস মিশন’

লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলা মোকাবিলায় ফ্রান্স, ইতালি ও গ্রিস ‘ইইউ অ্যাসপাইডস মিশন’ (EU Aspides Mission)-এর অধীনে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। তবে হরমুজ প্রণালীর প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এখনও পর্যন্ত কোনো ইউরোপীয় নৌবাহিনী হরমুজে সরাসরি ‘শিপ এসকর্ট’ বা পাহারার কাজ শুরু করতে রাজী হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি সামরিক সংঘাতে না জড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে পথ বের করাই এখন ইউরোপের মূল কৌশল।

ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি ও মার্কিন অবস্থান

এদিকে আটলান্টিকের ওপার থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কড়া বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সাফ জানিয়েছেন, যদি মিত্র দেশগুলোর জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা আসে, তবে ‘প্রয়োজন হলে’ মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে সরাসরি জাহাজ পাহারা (Escort) দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ট্রাম্পের এই হুঙ্কার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ফ্রান্স ও ইতালির কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে কিছুটা জটিল করে তুলতে পারে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ‘Tech Giant’ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—সবার নজর এখন মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকীর্ণ পানিসীমার দিকে। যদি আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কবলে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।