রমজানের দীর্ঘ সময় সিয়াম পালনের পর শরীরের শারীরিক সক্ষমতা ও সতেজতা বজায় রাখা অনেকটাই নির্ভর করে সেহরির খাদ্যতালিকায় আপনি কী রাখছেন তার ওপর। যেহেতু দিনের প্রায় ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা শরীর খাবার ও পানি থেকে বঞ্চিত থাকে, তাই সেহরির সময়টি কেবল উদরপূর্তির জন্য নয়, বরং সারাদিনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির সঞ্চয় বা ‘Energy Reservoir’ হিসেবে কাজ করে। পুষ্টিবিদদের মতে, সেহরির সঠিক মেনু নির্বাচন আপনার মেটাবলিজম (Metabolism) ঠিক রাখার পাশাপাশি পানিশূন্যতা ও অবসাদ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
সুষম ও জটিল শর্করার উপস্থিতি সেহরিতে এমন খাবার নির্বাচন করা উচিত যা হজম হতে সময় নেয় এবং দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগায়। একে পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘Complex Carbohydrates’ বা জটিল শর্করা। সাদা ভাতের বদলে লাল চালের ভাত বা ওটস (Oats) হতে পারে দারুণ বিকল্প। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে মৌসুমি সবজি ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার রাখা জরুরি। এটি কেবল পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে না, বরং রক্তের শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রেখে সারাদিন কাজ করার শক্তি জোগায়।
হাইড্রেশন ম্যানেজমেন্ট: পানির ঘাটতি মেটানোর উপায় দীর্ঘ সময় পানি পান না করায় শরীরে ডিহাইড্রেশন (Dehydration) হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে সেহরিতে একবারে অনেক বেশি পানি পান করা কোনো সমাধান নয়। বিশেষজ্ঞ পরামর্শ অনুযায়ী, ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত সময়টুকুতে অন্তত দুই থেকে আড়াই লিটার পানি অল্প অল্প করে পান করে শরীরের ‘Hydration’ স্তর স্বাভাবিক রাখা উচিত। সেহরির সময় পানিযুক্ত ফল যেমন তরমুজ, আনারস কিংবা শসা খাদ্যতালিকায় রাখা অত্যন্ত কার্যকর। এগুলো প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখে।
প্রোটিন ও ফাইবার: পেশি ও হজমের সুরক্ষা সেহরিতে মাছ, মাংস বা ডিমের মতো প্রোটিন (Protein) রাখা অপরিহার্য। এটি পেশির ক্ষয় রোধ করে এবং দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তির অনুভূতি দেয়। এছাড়া হজম প্রক্রিয়া সচল রাখতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে ‘Dietary Fiber’ হিসেবে ইসবগুলের ভুসি বা লেবুপানি খাওয়া যেতে পারে। এক গ্লাস দুধ বা টক দই সেহরির শেষে খাওয়ার অভ্যাস করলে তা পাকস্থলী ঠান্ডা রাখে এবং এসিডিটির ঝুঁকি কমায়।
যা এড়িয়ে চলবেন: ক্যাফেইন ও অতিরিক্ত লবণের প্রভাব অনেকেই সেহরির পর চা বা কফি পান করতে পছন্দ করেন, যা আসলে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ক্যাফেইন (Caffeine) যুক্ত পানীয় শরীর থেকে দ্রুত পানি বের করে দেয় (Diuretic effect), যা তৃষ্ণা বাড়িয়ে দেয় এবং পানিশূন্যতা তৈরি করে। একইভাবে অতিরিক্ত লবণ বা নোনতা খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ লবণ শরীরের পানি শুষে নেয় এবং তৃষ্ণা বাড়িয়ে দেয়। প্রক্রিয়াজাত খাবার বা অতিরিক্ত ঝাল-মসলাযুক্ত ‘Junk Food’ সেহরিতে একেবারেই বর্জনীয়।
সুস্থভাবে রমজানের রোজা পালন করতে সেহরি হোক হালকা কিন্তু পুষ্টিগুণে ভরপুর। মনে রাখবেন, অতিরিক্ত খাওয়া নয়, বরং সঠিক ও সুষম খাবারই আপনাকে সারাদিন কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করবে।