বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এক উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠকে মিলিত হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ) রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ার। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারে Mutual Tariff (পারস্পরিক শুল্ক হার), বিনিয়োগের পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক পরিচালক এমিলি অ্যাশবি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দলের যুক্তরাষ্ট্র-মুখপাত্র প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নাকিবুর রহমান বৈঠকে অংশ নেন।
শুল্ক হ্রাস ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ উদ্যোগ
বৈঠকের শুরুতেই ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ারকে এই আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। বিশেষ করে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক হ্রাস সংক্রান্ত বিষয়ে গ্রিয়ারের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি। রাষ্ট্রদূত গ্রিয়ার বৈঠকে জানান, বাংলাদেশের জন্য শুল্ক সুবিধার বিষয়টি নিয়ে তিনি গত সপ্তাহেই ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং ইতিবাচক আলোচনা করেছেন। এই বিশেষ কূটনৈতিক তৎপরতাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী।
পোশাক খাতে ‘উইন-উইন ফর্মুলা’র প্রস্তাব
বৈঠকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রফতানি বাড়াতে একটি বিশেষ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ শতাংশ তুলা (Cotton) অথবা সে দেশে উৎপাদিত Man-made Fiber (মানবসৃষ্ট তন্তু) ব্যবহার করে পোশাক তৈরি করে, তবে সেসব পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ শুল্ক সুবিধা প্রদান করবে। ডা. শফিকুর রহমান এই প্রস্তাবকে উভয় দেশের জন্য একটি ‘Win-Win Formula’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এর ফলে একদিকে যেমন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের Market Access সহজতর হবে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা চাষি ও শিল্প খাত সরাসরি উপকৃত হবে।
বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবিলা ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি
পারস্পরিক শুল্ক চুক্তিকে বাংলাদেশ-মার্কিন অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জানান, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলি বাস্তবায়ন শুরু করেছে, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। জামায়াতে আমির স্পষ্ট করেন যে, তার দল একটি টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক বাণিজ্যে বিশ্বাসী, যেখানে উভয় দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে।
ডিএফসি তহবিল ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি
বিনিয়োগের প্রসারে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কর্পোরেশন’ (DFC)-এর তহবিলে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার নিয়ে রাষ্ট্রদূত গ্রিয়ার ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। ডা. শফিকুর রহমান এই সমর্থনকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ডিএফসি অর্থায়নের সুযোগ পেলে বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পায়ন গতিশীল হবে, যা Job Creation বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও জামায়াতের অবস্থান
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রদূতকে আশ্বস্ত করেন যে, নির্বাচনের পর যদি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করার সুযোগ পায়, তবে বর্তমান সরকারের অধীনে শুরু হওয়া এই বাণিজ্যিক চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে আরও গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বৈঠকের শেষে ডা. শফিকুর রহমান রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ারকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, উচ্চপর্যায়ের এই যোগাযোগ দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।