গবেষণায় উঠে আসা ভয়াবহ চিত্র
২৬ জানুয়ারি ২০২৬, রবিবার বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে ‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ’ শীর্ষক জাতীয় গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়। এই গবেষণায় সিগারেট সেবনকে মাদকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিএমইউ এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তত্ত্বাবধানে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলার তথ্য সংগ্রহ করে এই গবেষণা সম্পন্ন করে।
বিভাগভিত্তিক মাদক ব্যবহারের হার
বিভাগ ভেদে মাদক ব্যবহারের হারে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। ময়মনসিংহে এই হার সবচেয়ে বেশি (৬.০২ শতাংশ)। এরপর রয়েছে রংপুর (৬ শতাংশ), চট্টগ্রাম (৫.৫০ শতাংশ), খুলনা (৪.০৮ শতাংশ) এবং রাজশাহী (২.৭২ শতাংশ)। সংখ্যার বিচারে ঢাকা বিভাগে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—প্রায় ২২.৯ লাখ। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ১৮.৮ লাখ এবং রংপুর বিভাগে প্রায় ১০.৮ লাখ ব্যবহারকারী আছেন।
মাদকের ধরন ও প্রাথমিক ঝুঁকি
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাঁজা দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক (৬১ লাখ)। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন (প্রায় ২৩ লাখ) এবং অ্যালকোহল (২০ লাখ)। এ ছাড়া কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইনও অনেকে সেবন করে। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার, যা তাদের এইচআইভি, হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে ফেলছে। বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ ও অনানুষ্ঠানিক পেশাকে মাদক ব্যবহারের মূল ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দুর্বলতা
গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক সহজলভ্য হওয়া আসক্তির অন্যতম কারণ। মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে সফল হতে পারেননি। বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক মো. শাহিনুল আলম বলেন, মাদকের বিস্তার এখন শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, প্রায় অর্ধেক মাদকাসক্ত ব্যক্তি আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চান। তবে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তার অভাব এর পথে প্রধান বাধা। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া মাদক নির্মূল করা কার্যত অসম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।
সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
ডিএনসির মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি অভিভাবকদের সন্তানের আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে কি না সে বিষয়ে সচেতন থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, বর্তমানে ডিএনসি সরবরাহ কমানো, চাহিদা কমানো এবং ক্ষতি হ্রাস—এই তিনটি স্তরে কাজ করছে।