ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে ‘আব্রাহাম চুক্তিতে’ (Abraham Accords) পাকিস্তানের যোগদানের খবরকে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইসলামাবাদ। ফিলিস্তিন ইস্যুতে দেশটির দীর্ঘদিনের নীতিগত অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি বলেও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ইসলামাবাদে এক সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি এই গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি দেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল যে, পাকিস্তান হয়তো ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পথে হাঁটছে। সেই জল্পনা নাকচ করে আন্দ্রাবি বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে পাকিস্তান বরাবরের মতোই পাশে আছে।
শান্তি বোর্ড ও আব্রাহাম চুক্তির পার্থক্য
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র স্পষ্ট করেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ (Board of Peace)-এ পাকিস্তানের অংশগ্রহণের সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, “শান্তি বোর্ডে যোগদানের অর্থ এই নয় যে পাকিস্তান আব্রাহাম চুক্তিতে সই করছে বা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এটি ফিলিস্তিন বিষয়ে আমাদের জাতীয় নীতির কোনো বিচ্যুতি নয়।”
তিনি আরও জানান, শান্তি বোর্ডে যোগদানের বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। যথাযথ প্রক্রিয়াগত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই এই Strategic Decision নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের মূল উদ্দেশ্য: গাজা ও ফিলিস্তিন পুনর্গঠন
শান্তি বোর্ডে পাকিস্তানের সক্রিয় অংশগ্রহণের নেপথ্যে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরেন তাহির আন্দ্রাবি। তিনি জানান, গাজায় চলমান সংঘাত বন্ধে একটি সুসংহত ও টেকসই যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) নিশ্চিত করা ইসলামাবাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এছাড়া সংঘাত-পরবর্তী গাজার পুনর্গঠন (Post-war Reconstruction) এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের (Self-determination) ভিত্তিতে একটি স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায় পাকিস্তান।
মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান
পাকিস্তান এই উদ্যোগে একা নয় বরং একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোটের অংশ হিসেবে কাজ করছে। মুখপাত্র জানান, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া এবং কাতার—এই সাতটি প্রভাবশালী মুসলিম দেশও একই শান্তি বোর্ডে যোগ দিয়েছে। মূলত একটি সম্মিলিত কূটনৈতিক ফ্রন্ট (Diplomatic Front) গঠন করে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধানের লক্ষ্যেই এই দেশগুলো কাজ করছে।
প্রেক্ষাপট: আব্রাহাম চুক্তির ইতিহাস
২০২০ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ‘আব্রাহাম চুক্তিতে’ সই করে। পরবর্তীতে মরক্কো ও সুদানও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। তবে পাকিস্তান শুরু থেকেই বলে আসছে, ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তারা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না।
পাকিস্তানের এই সাম্প্রতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। একদিকে মার্কিন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকা, অন্যদিকে ফিলিস্তিন নীতিতে অনড় থাকা—এই ভারসাম্যের কূটনীতি (Balancing Diplomacy) দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের প্রভাব কতটুকু ধরে রাখতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।