আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির (International Politics) উত্তপ্ত আবহে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছে চীন। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বেইজিং স্পষ্ট জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ‘সামরিক দুঃসাহসিকতা’ (Military Adventurism) এই অঞ্চলটিকে এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দেবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UN Security Council) এক গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে এই অবস্থান ব্যক্ত করেন জাতিসংঘে চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি ফু কং। ফিলিস্তিন ইস্যু ও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এই উন্মুক্ত বিতর্কে চীনের প্রতিনিধি মার্কিন নীতির কঠোর সমালোচনা করেন।
শক্তির প্রয়োগ সমস্যার সমাধান নয়: চীন
ফু কং তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, পেশ পেশিশক্তি বা সামরিক আস্ফালন দিয়ে কখনো দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, “যেকোনো ধরনের সামরিক উসকানি মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান ভারসাম্য নষ্ট করবে এবং অঞ্চলটিকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাবে।” চীনের এই অবস্থান মূলত ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যারা সম্প্রতি ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে।
সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা
চীন মনে করে, ইরান একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র (Sovereign State) এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার কেবল সে দেশের জনগণের। জাতিসংঘে চীনের প্রতিনিধি বলেন, “আমরা সব পক্ষকে জাতিসংঘ সনদের (UN Charter) উদ্দেশ্য ও নীতিমালা মেনে চলার আহ্বান জানাই। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে চীন তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগের হুমকি আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয় মধ্যপ্রাচ্য
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতাকে বৃহৎ শক্তিগুলোর ‘ভূ-রাজনৈতিক খেলা’ (Geopolitical Game) হিসেবে অভিহিত করে চীন জানিয়েছে, এই অঞ্চলটি কোনো বড় শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দান হওয়া উচিত নয়। ফু কং বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক দেশগুলোর আহ্বানে সাড়া দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব। বেইজিং চায় ওয়াশিংটন এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকুক, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।”
চীনের কৌশলগত অবস্থান ও মধ্যস্থতা
চীন কেবল সতর্কবার্তাই দেয়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। বেইজিংয়ের মতে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা (Regional Stability) বজায় রাখা কেবল ইরানের জন্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতির নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য। চীন আশা করে যে, যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করবে এবং যুদ্ধের পথ পরিহার করে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটবে।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় এবং সামরিক মহড়া কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের এই দৃঢ় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।