তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি (Nuclear Program) এবং আঞ্চলিক প্রভাব রুখতে ডনাল্ড ট্রাম্প যখন চরম হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, ঠিক তখনই ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে এক বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। মার্কিন সিনেট কমিটির এক শুনানিতে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বা 'রেজিম' ভেঙে পড়লে তার স্থলাভিষিক্ত কে হবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের কাছে কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। রুবিওর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ইরান কি পরবর্তী ভেনেজুয়েলা?
মার্কিন সিনেটে শুনানির সময় মার্কো রুবিও ইরানের পরিস্থিতিকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি জানান, ভেনেজুয়েলায় শাসন পরিবর্তনের (Regime Change) বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে যতটা সহজ মনে হয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রে সমীকরণটি ততটাই জটিল। তেহরানের বর্তমান কাঠামো এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রভাব এতটাই গভীরে যে, এর পতন হলে পরবর্তী শূন্যস্থান কে পূরণ করবে তা অনুমান করা অসম্ভব। রুবিওর ভাষায়, "এটি এমন কোনো খাবার নয় যা ওভেনে গরম করে (Microwave) চটজলদি খেয়ে নেওয়া যায়। ইরানের পরিস্থিতি অনেক বেশি সংবেদনশীল।"
খামেনি-পরবর্তী নেতৃত্ব ও মার্কিন ধোঁয়াশা
রুবিও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বা বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন হলে সেখানে কোনো গণতান্ত্রিক বা স্থিতিশীল নেতৃত্বের উত্থান ঘটবে কি না, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো রোডম্যাপ নেই। নেতৃত্বের এই অনিশ্চয়তা ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকদের জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত একটি শক্তিশালী বিকল্প নেতৃত্ব ছাড়া ইরানে ক্ষমতার পালাবদল ঘটাতে গেলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন।
ট্রাম্পের আল্টিমেটাম ও নৌবহরের পদধ্বনি
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে কোনো কার্পণ্য করছেন না। সম্প্রতি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ (Truth Social) এক পোস্টে তিনি ইরানকে কড়া আল্টিমেটাম দিয়েছেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, একটি বিশাল মার্কিন নৌবহর বা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার (Aircraft Carrier) এবং যুদ্ধজাহাজ ইতিমধ্যেই ইরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের এই সামরিক হুমকি তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধুলিসাৎ করার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তেহরানের পাল্টা হুঙ্কার: আলোচনার দরজা কি বন্ধ?
মার্কিন হুমকির মুখে নতি স্বীকার করতে নারাজ ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো ধরণের জবরদস্তি বা 'আল্টিমেটাম' (Ultimatum) দিয়ে তেহরানকে দমানো যাবে না। তিনি বলেন, "ইরানি বাহিনী যেকোনো যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।" তবে যুদ্ধের আবহের মধ্যেও কূটনীতির সুযোগ রাখছেন আরাঘচি। তিনি জানান, যদি মার্কিন পক্ষ থেকে হুমকি বন্ধ করা হয় এবং একটি 'ন্যায্য চুক্তি'র পরিবেশ তৈরি করা হয়, তবে তেহরান আলোচনায় বসতে আগ্রহী।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ট্রাম্পের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের কৌশল এবং অন্যদিকে মার্কো রুবিওর নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বাইডেন-পরবর্তী ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতি এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। শাসন পরিবর্তনের ইচ্ছা থাকলেও, তার পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি ওয়াশিংটনের আছে কি না, তা নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের অন্দরেই এখন শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।