ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে নিকোলা মাদুরোর পতনের পর ক্ষমতার অলিন্দে এখন দেলসি রদ্রিগেজ। কিন্তু তিনি কি আদেও ওয়াশিংটনের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন? নাকি নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ দেশগুলো? ভেনেজুয়েলার এই অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে এবার গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করেছে খোদ মার্কিন Intelligence Agency বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
রয়টার্সের একটি বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন কি না—তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্দরে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চারটি সূত্র জানিয়েছে, নিজের দেশে মার্কিন কৌশল বা US Strategy-র সঙ্গে রদ্রিগেজ পুরোপুরি একমত কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে।
ওয়াশিংটনের শর্ত ও কারাকাসের নীরবতা
মার্কিন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে, ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতার স্বার্থে রদ্রিগেজকে ইরান, চীন ও রাশিয়ার মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গে Diplomatic Ties বা কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। শুধু তাই নয়, ওই দেশগুলোর কূটনীতিক ও সামরিক উপদেষ্টাদেরও ভেনেজুয়েলা থেকে বহিষ্কার করার শর্ত জুড়ে দিয়েছে ওয়াশিংটন।
তবে বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন। চলতি মাসের শুরুতে রদ্রিগেজের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন ইরান, চীন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিরা। গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো বন্দী হওয়ার পর রদ্রিগেজ ক্ষমতা গ্রহণ করলেও, এখন পর্যন্ত তিনি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি। এই নীরবতাই ওয়াশিংটনের সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে।
সিআইএ প্রধানের ঝটিকা সফর ও গোয়েন্দা সংশয়
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য গত ১৫ জানুয়ারি কারাকাসে ঝটিকা সফরে গিয়েছিলেন মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা CIA-র পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। রদ্রিগেজের সঙ্গে তার একান্ত বৈঠক হলেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নেতিবাচক মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিম গোলার্ধে (Western Hemisphere) তাদের শত্রুদের প্রভাব কমানো এবং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদ বা Energy Sector-কে নিয়ন্ত্রণে আনা। যদি রদ্রিগেজ শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের পক্ষ ত্যাগ করেন, তবেই ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতে বড় ধরনের মার্কিন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যথায়, সরাসরি Military Intervention বা সামরিক হস্তক্ষেপ এড়ানোর যে পরিকল্পনা হোয়াইট হাউস করছে, তা ভেস্তে যেতে পারে।
তেল বনাম রাজনৈতিক স্বার্থ: রদ্রিগেজের কৌশলী অবস্থান
মাদুরো অপসারিত হওয়ার পর দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রদ্রিগেজ কিছু মার্কিনপন্থী পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রির অনুমোদন দেওয়া। বিষয়টিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইতিবাচকভাবে দেখলেও, রদ্রিগেজের সাম্প্রতিক ভাষণ ওয়াশিংটনকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। গত রবিবার এক ভাষণে তিনি বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে ‘অত্যন্ত বিরক্ত’।
তবে পর্দার আড়ালে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। রয়টার্সের সূত্রমতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে রদ্রিগেজের বেশ কিছু ‘ইতিবাচক’ ফোনালাপ হয়েছে। এই দ্বিমুখী অবস্থানই তাকে গোয়েন্দাদের আতশিকাঁচের নিচে দাঁড় করিয়েছে।
মাচাদো বনাম রদ্রিগেজ: ক্ষমতার সমীকরণ
মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় জনপ্রিয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো বর্তমানে দেশ পরিচালনার কার্যকর অবস্থানে নেই। মাচাদোর সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী বা তেল খাতের কর্মকর্তাদের কোনো শক্তিশালী সংযোগ নেই। ফলে জনগণের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং হোয়াইট হাউসের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও মাচাদোকে এখনই নেতৃত্বে আনার ঝুঁকি নিচ্ছে না ওয়াশিংটন।
সিআইএ-র মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার শাসনতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে মাদুরো সরকারের সাবেক অনুগতরাই বর্তমানে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত অবস্থানে রয়েছেন। আর সেই সমীকরণেই ডেলসি রদ্রিগেজ এখন ওয়াশিংটনের জন্য ‘প্রয়োজনীয় কিন্তু সন্দেহভাজন’ এক চরিত্র।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার নেতাদের ওপর ‘Maximum Pressure’ বা সর্বোচ্চ চাপ বজায় রেখেছেন। এখন দেখার বিষয়, দেলসি রদ্রিগেজ রাশিয়ার কক্ষপথ ছেড়ে পুরোপুরি মার্কিন বলয়ে যোগ দেন, নাকি এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সূচনা করেন।