রংপুরবাসীর দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে আজ। দীর্ঘ ২২ বছর পর উত্তর জনপদের প্রাণকেন্দ্র রংপুরে পা রাখছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই সফর কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নির্বাচনী প্রচারণা নয়, বরং এটি রূপ নিয়েছে এক আবেগঘন এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক যাত্রায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের (July Uprising) প্রথম শহীদ আবু সাঈদের রক্তস্নাত মাটিকে স্পর্শ করে আগামীর রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন বার্তা দেবেন তিনি— এমনটাই প্রত্যাশা তৃণমূলের।
শহীদ আবু সাঈদের আঙিনায় তারেক: এক প্রতীকী যাত্রা
দলীয় কর্মসূচি অনুযায়ী, তারেক রহমান প্রথমে বগুড়ায় পৌঁছাবেন। সেখান থেকে সড়কপথে রংপুরে প্রবেশের সময় তিনি পীরগঞ্জের জাফরপাড়ায় থামবেন। জুলাই বিপ্লবের অগ্রসেনানী ও বীর শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কবর জিয়ারত কেবল শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, বরং ছাত্র-জনতার বিপ্লবের প্রতি বিএনপির সংহতি এবং শহীদদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানানোর একটি শক্তিশালী প্রতীকী বার্তা। শহীদ আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
কালেক্টরেট মাঠে জনসমুদ্রের অপেক্ষা: আসবে কি উন্নয়নের বড় ঘোষণা?
শহীদ আবু সাঈদের গ্রাম থেকে তারেক রহমান সরাসরি রওনা হবেন রংপুরের ঐতিহাসিক কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠের উদ্দেশ্যে। বিকেল সাড়ে ৪টায় সেখানে এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেবেন তিনি। দীর্ঘদিন পর প্রিয় নেতাকে সামনে থেকে দেখার এবং তার কথা শোনার জন্য সকাল থেকেই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা রংপুরে সমবেত হতে শুরু করেছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, এই জনসভা থেকে তারেক রহমান রংপুরের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বঞ্চনা ঘোচাতে বড় ধরনের কোনো পরিকল্পনার কথা জানাবেন। বিশেষ করে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ (Teesta Master Plan) বাস্তবায়ন, এই অঞ্চলে ‘স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ (Special Economic Zone) বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ এবং স্থবির হয়ে পড়া স্থলবন্দরগুলো পুনরায় সচল করার মতো সুনির্দিষ্ট ইস্যুগুলো তার বক্তব্যে উঠে আসতে পারে।
‘ঊষর মরুতে এক পশলা বৃষ্টি’: উচ্ছ্বসিত তৃণমূল
তারেক রহমানের এই আগমনকে স্থানীয় নেতাকর্মীরা ‘মরুভূমিতে বৃষ্টির’ সঙ্গে তুলনা করছেন। রংপুর বিএনপির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, এই সফরের মাধ্যমেই আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি পূর্ণাঙ্গ ‘রোডম্যাপ’ (Roadmap) ঘোষিত হবে। বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবীব দুলু বলেন, “রংপুর বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। আমরা চাই এই অঞ্চলের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল আধুনিকীকরণ হোক। পাশাপাশি বীর শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি রক্ষার্থে তার নামে একটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা জাতীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি আমাদের রয়েছে।”
নিরাপত্তার চাদরে রংপুর: আকাশ ও স্থলে কঠোর নজরদারি
হাই-প্রোফাইল (High-profile) এই সফরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না প্রশাসন। পুরো রংপুর শহরকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বলয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (RMP) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থলপথের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোর ছাদে (Rooftop) পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মজিদ আলী গণমাধ্যমকে জানান, “জনসভার ভেন্যু এবং মুভমেন্টের রাস্তাগুলো সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখতে আমরা গোয়েন্দা নজরদারি ও কঠোর সিকিউরিটি প্রটোকল (Security Protocol) অনুসরণ করছি। ইউনিফর্মে থাকা পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও বিপুল সংখ্যক ফোর্স মোতায়েন রয়েছে।”
সমাবেশ শেষে তারেক রহমান আজ রাতেই রংপুরে অবস্থান করবেন এবং শনিবার সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। দীর্ঘ দুই যুগ পর তার এই অবস্থান এবং সফর উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জনমতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।