বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণে এক অবাক করা পটপরিবর্তন ঘটিয়ে চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে বড় পদক্ষেপ নিল যুক্তরাজ্য। শুল্ক যুদ্ধ এবং নানাবিধ ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে যখন বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, ঠিক তখনই চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে হাত মেলালেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। এই সফরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্ক কাটিয়ে দুই দেশ এক নতুন ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বের’ (Strategic Partnership) যুগে প্রবেশের ইঙ্গিত দিয়েছে।
ভিসা-মুক্ত ভ্রমণ ও বাণিজ্যিক প্রণোদনা
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত যুক্তরাজ্য-চীন বিজনেস কাউন্সিলে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, বেইজিংয়ের সঙ্গে হওয়া নতুন চুক্তি অনুযায়ী এখন থেকে ব্রিটিশ নাগরিকরা কোনো ভিসা ছাড়াই ৩০ দিনের জন্য চীনে ভ্রমণ করতে পারবেন। পর্যটন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ব্রিটিশ রফতানি খাতের জন্য বড় সুসংবাদ নিয়ে এসেছেন স্টারমার। চীনের বাজারে ব্রিটিশ হুইস্কির ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক (Import Tariff) ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে বেইজিং। বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আয়োজিত এই সভায় ব্রিটেনের ৬০টি এবং চীনের ৫০টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির প্রতিনিধিরা সরাসরি আলোচনায় অংশ নেন।
অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিশাল বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য
এই সফরের অন্যতম বড় চমক ছিল ব্রিটিশ ফার্মা জায়ান্ট (Pharma Giant) অ্যাস্ট্রাজেনেকার ঘোষণা। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা চীনে ১ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের মতে, এই বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সমঝোতা যুক্তরাজ্যে নতুন কর্মসংস্থান (Job Creation) তৈরি করবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে (Economic Growth) বিশেষ সহায়ক হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্রিটেন এখন ফ্রান্স, জার্মানি এবং জাপানের মতো দেশগুলোর কাতারে যোগ দিল, যারা ওয়াশিংটনের চাপ সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে।
শি-স্টারমার বৈঠক: বিশ্ব শান্তির লক্ষ্যে নিয়মিত সংলাপ
সফরকালে বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপলে’ চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেন কিয়ার স্টারমার। বৈঠকের শুরুতে শি জিনপিং যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ (Regular Dialogue) জরুরি।” প্রধানমন্ত্রী স্টারমারও প্রতিউত্তরে জানান যে, চীনের সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমেই যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও কূটনৈতিক বিতর্ক
যুক্তরাজ্য ও চীনের এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ভালোভাবে নেয়নি হোয়াইট হাউস। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, চীনের সঙ্গে এই ধরণের গভীর সম্পর্ক যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তার (National Security) জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ভিসা-মুক্ত ভ্রমণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খাতে বড় বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়াকে তিনি বিপজ্জনক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘স্পেশাল রিলেশনশিপ’ রক্ষা করা এবং অন্যদিকে চীনের বিশাল বাজার ও বিনিয়োগকে (Foreign Investment) কাজে লাগানো— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন লন্ডনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।