বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির মানচিত্রে চীনকে টেক্কা দিতে আরও একধাপ এগিয়ে গেল ভারত। গ্লোবাল 'সাপ্লাই চেইন' (Supply Chain) থেকে বেইজিংয়ের একচেটিয়া আধিপত্য কমাতে এবার লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের সাথে হাত মেলাল নয়াদিল্লি। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) নয়াদিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার মধ্যে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকের মূল নির্যাস হলো— গুরুত্বপূর্ণ খনিজ (Critical Minerals) এবং বিরল মৃত্তিকা (Rare Earth Elements) উত্তোলনে দুই দেশের মধ্যকার কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি।
ড্রাগনের দাপট কমাতে ‘স্ট্র্যাটেজিক’ চাল বর্তমান বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV), স্মার্টফোন এবং উচ্চ প্রযুক্তির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির জন্য 'রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস' বা বিরল মৃত্তিকা অপরিহার্য। এই খনিজ সম্পদের উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণে দীর্ঘকাল ধরে চীনের একাধিপত্য বজায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে চীন এই খনিজ রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় বিপাকে পড়েছে ভারতসহ পশ্চিমা দেশগুলো। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের এই চুক্তিটি মূলত বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব 'রিসোর্স সিকিউরিটি' নিশ্চিত করার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।
** supply chain ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর** বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক বিবৃতিতে বলেন, "গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং বিরল মৃত্তিকা সংক্রান্ত এই চুক্তিটি একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) তৈরির দিকে বড় পদক্ষেপ। এটি কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি করবে না, বরং ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল পরিকাঠামো খাতের চাহিদাও পূরণ করবে।"
উল্লেখ্য, ভারত বর্তমানে দ্রুততম গতিতে পরিকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পায়ন ঘটাচ্ছে, যার ফলে আকরিক লোহার (Iron Ore) চাহিদা তুঙ্গে। অস্ট্রেলিয়ার পর ব্রাজিল হলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আকরিক লোহা উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশ। ফলে এই চুক্তি ভারতের স্টিল ইন্ডাস্ট্রি ও রিয়েল এস্টেট খাতের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
লুলা দা সিলভার তিন দিনের দিল্লি সফর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বুধবার ভারতে পৌঁছান ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা। তাঁর এই সফরে প্রাধান্য পেয়েছে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিনিময়। লুলা বলেন, "নবায়নযোগ্য শক্তি (Renewable Energy) এবং খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধিই আমাদের আজকের আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য ছিল। আমরা এমন এক অংশীদারিত্ব চাই যা দুই দেশের অর্থনীতিকেই টেকসই করবে।"
বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা খাতে গভীরতা ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য উচ্চমানের উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ বলছে, বেইজিংয়ের ওপর অতিনির্ভরশীলতা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গত জুলাই মাসে মোদির ব্রাজিল সফরের সময় প্রতিরক্ষা, জ্বালানি এবং খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে সমঝোতার পথ তৈরি হয়েছিল, লুলার বর্তমান সফর তাকে এক পূর্ণতা দিল। বিশেষ করে গ্রিন হাইড্রোজেন এবং ইথানল প্রযুক্তিতে ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা ভারতের ‘নেট জিরো’ লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করবে।
এই খনিজ চুক্তিটি কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক বার্তা। দক্ষিণ গোলার্ধের (Global South) দুই প্রধান শক্তি ভারত ও ব্রাজিল একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে।