মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে শান্তির আশা আবারও ফিকে হয়ে আসছে। গত নভেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি (Ceasefire Agreement) লঙ্ঘন করে লেবাননের বিভিন্ন প্রান্তে ভয়াবহ বিমান হামলা (Air Strike) চালিয়েছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় বেকা উপত্যকা এবং দক্ষিণাঞ্চলের জনবহুল শরণার্থী শিবিরে এই প্রাণঘাতী অভিযানে হিজবুল্লাহর একজন উচ্চপদস্থ কমান্ডারসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৫ জনেরও বেশি মানুষ, যাদের অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক।
রণাঙ্গন এখন বেকা উপত্যকা: লক্ষ্য যখন কমান্ড সেন্টার
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা (NNA) জানিয়েছে, শুক্রবার দেশের পূর্বাঞ্চলীয় বেকা উপত্যকায় তীব্র হামলা চালায় ইসরাইলি যুদ্ধবিমান। এই অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর (IDF) দাবি, তারা ওই এলাকায় হিজবুল্লাহর একটি ‘কমান্ড সেন্টার’ (Command Center) লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিজবুল্লাহর একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, নিহতদের মধ্যে তাদের সশস্ত্র গোষ্ঠীর একজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার রয়েছেন। এই হামলাটি এমন এক সময়ে চালানো হলো যখন লেবাননের সাধারণ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত (Conflict) শেষে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিল। স্থানীয় হাসপাতালগুলো জানিয়েছে, আহত ২৫ জনকে বিভিন্ন জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে এবং সেখানে রক্তের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
শরণার্থী শিবিরেও আগুনের লেলিহান শিখা
বেকা উপত্যকার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননের সিডন শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত দেশটির বৃহত্তম ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবির ‘আইন এল-হিলওয়েহ’-তে (Ain al-Hilweh Camp) বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এই হামলায় অন্তত দুইজন নিহত হয়েছেন।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, শরণার্থী শিবিরে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল হামাস সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তু। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চললেও হামাসকে নির্মূল করার অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে একটি ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরে এ ধরনের সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের শামিল বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান ঘটাতে হিজবুল্লাহ ও ইসরাইল একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছেছিল। তবে সেই চুক্তির স্থায়ীত্ব এখন বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই লেবাননের আকাশে ইসরাইলি ড্রোনের আনাগোনা এবং বিচ্ছিন্ন বিমান হামলা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তাদের কমান্ডারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, ইসরাইল ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে পরিস্থিতিকে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের (Total War) দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলার পর লেবানন-ইসরাইল সীমান্তে নতুন করে সেনা মোতায়েন শুরু হয়েছে, যা গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। তা না হলে এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি অচিরেই ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে, যার ফলাফল হবে আরও দীর্ঘমেয়াদী মানবিক বিপর্যয়।