মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তজনা এখন চরম শিখরে। এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ইরানে অবস্থানরত নিজ দেশের নাগরিকদের ‘অবিলম্বে’ দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে সুইডেন। তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে এই জরুরি ‘Travel Advisory’ বা ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে স্টকহোম।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জরুরি সতর্কবার্তা
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমার স্টেনগার্ড এক বিবৃতিতে ইরানে অবস্থানরত সুইডিশ নাগরিকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশটি ত্যাগের আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত অনিশ্চিত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
স্টেনগার্ড লিখেছেন, "ইরান ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক ও অনিশ্চিত। এই অবস্থায় যে কোনো ধরণের ইরান সফর এড়িয়ে চলা উচিত এবং যারা ইতিমধ্যে দেশটিতে অবস্থান করছেন, তাদের দ্রুত ফিরে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান 'Security Protocol' অনুযায়ী এখন পর্যন্ত আকাশপথ ও স্থল সীমান্তগুলো খোলা রয়েছে, তাই সময় থাকতে এই সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।
‘নিজ দায়িত্বে’ থাকার হুঁশিয়ারি
সুইডিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সরকার কোনো ‘Evacuation’ বা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম নাও হতে পারে। তিনি বলেন, "এখনও সুযোগ আছে, দেরি করা ঠিক হবে না। যারা এই নির্দেশের পরও ইরানে থাকার সিদ্ধান্ত নেবেন, তাদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ঝুঁকিতে থাকতে হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো বিশেষ সহায়তা দিতে পারবে না।"
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও সামরিক প্রস্তুতির গুঞ্জন
সুইডেনের এই তড়িঘড়ি পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কড়া হুঁশিয়ারি। পারমাণবিক ইস্যু (Nuclear Issue) নিয়ে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের টানাপোড়েন এখন যুদ্ধের দোরগোড়ায়। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, ইরানকে চাপের মুখে রাখতে একটি ‘সীমিত হামলার’ (Limited Strike) পরিকল্পনা বিবেচনা করছে মার্কিন প্রশাসন। তিনি সতর্ক করে বলেন, তেহরান যদি একটি ‘ন্যায্য চুক্তিতে’ (Fair Deal) পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে ফল অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
লক্ষ্যবস্তু হতে পারে পারমাণবিক অবকাঠামো
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা এখন ‘উন্নত পর্যায়ে’ পৌঁছেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হলে কয়েক সপ্তাহব্যাপী একটি সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে। এই অভিযানে মূলত ইরানের নিরাপত্তা স্থাপনা (Security Installation) এবং পারমাণবিক অবকাঠামোকে (Nuclear Infrastructure) লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এমনকি নির্দেশ পেলে ইরানের ‘Regime Change’ বা শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্যে শীর্ষ নেতাদের ওপর টার্গেটেড হামলা চালানোর পরিকল্পনাও পেন্টাগনের টেবিলে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থান এবং সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের খবরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, যার প্রথম প্রতিফলন দেখা গেল সুইডেনের এই জরুরি নির্দেশনায়।