মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক আকাশে যুদ্ধের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হয়েছে। পারস্য উপসাগরে নজিরবিহীনভাবে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরানের জন্য ‘সময় ফুরিয়ে আসছে’। ট্রাম্পের এই চরমপত্রের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই পাল্টা যুদ্ধের প্রস্তুতি ঘোষণা করেছে ইরান। আগামী সপ্তাহেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) সরাসরি গোলাবর্ষণসহ বিশাল নৌ মহড়া চালানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
পারস্য উপসাগরে মার্কিন শক্তির মহড়া
ইরানকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার কৌশলে মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, গত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক ডেস্ট্রয়ার (Destroyer) ‘ইউএসএস ডেলবার্ট ডি. ব্ল্যাক’ মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এই নতুন রণতরীটি যুক্ত হওয়ার ফলে বর্তমানে ওই অঞ্চলে মার্কিন ডেস্ট্রয়ারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়ে।
সামরিক সক্ষমতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে এই অঞ্চলে একটি বিমানবাহী রণতরী (Aircraft Carrier) এবং তিনটি লিটোরাল কমব্যাট শিপ (Littoral Combat Ship) মোতায়েন রেখেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্র পিট হেগসেথ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা রুখতে ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত পদক্ষেপের আগে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকসহ সব ধরনের বিকল্প (Options) পুনর্বিবেচনা করছেন।
পাল্টা জবাবে তেহরানের রণকৌশল
যুক্তরাষ্ট্রের এই নজিরবিহীন সামরিক চাপের মুখে দমে না গিয়ে উল্টো শক্তি প্রদর্শনের পথে হেঁটেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের অভিজাত রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC)-এর নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে বড় ধরনের মহড়া শুরু করতে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে আজই যুক্ত করা হয়েছে এক হাজার অত্যাধুনিক ড্রোন (Drone), যা যেকোনো আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে সক্ষম।
আইআরজিসি-র মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নায়েনি বলেন, “প্রতিপক্ষের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ বা ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড’ মোকাবিলায় তেহরানের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা (Action Plan) প্রস্তুত রয়েছে। আমরা যেকোনো সামরিক পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণ তৈরি।”
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ ও মিত্রদের অবস্থান
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতের আবহে বিশ্বনেতারা দ্বিধাবিভক্ত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সামরিক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন না দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাজ্য। অন্যদিকে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা ‘রোসাটম’ জানিয়েছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে তাদের কর্মীদের সরিয়ে নিতে মস্কো সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ইতিমধ্যে ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপ করেছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহের অভিযোগে আইআরজিসি-কে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও একমত হয়েছেন ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
কূটনৈতিক সমাধানের শেষ চেষ্টা
যুদ্ধের দামামা বাজলেও আঞ্চলিক শক্তিগুলো সংঘাত নিরসনে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সতর্ক করে বলেছেন, “ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান হবে একটি মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত।” তিনি দুই দেশকেই আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানান। এই কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে শুক্রবার আঙ্কারা সফরে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
বিশ্ব রাজনীতি এখন তাকিয়ে আছে হরমুজ প্রণালীর দিকে। ট্রাম্পের ‘চরমপত্র’ আর তেহরানের ‘রণপ্রস্তুতি’ কি শেষ পর্যন্ত একটি বড় ধরণের আঞ্চলিক যুদ্ধের সূচনা করবে, নাকি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান আসবে—তা আগামী কয়েক দিনেই পরিষ্কার হবে।