মিয়ানমারে সামরিক জান্তার অধীনে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে দেশটির শাসকগোষ্ঠী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট আসিয়ান (ASEAN) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই নির্বাচনের ফলাফলকে কোনোভাবেই স্বীকৃতি দিচ্ছে না। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ফিলিপিন্সের মধ্যাঞ্চলীয় শহর সেবুতে আয়োজিত আসিয়ানের মন্ত্রী পর্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
আসিয়ানের অনড় অবস্থান ও কূটনৈতিক বার্তা
আসিয়ানের বর্তমান সভাপতি ফিলিপিন্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা লাজারো এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে জানান, জোটের সদস্য দেশগুলো মিয়ানমারের নির্বাচন নিয়ে কোনো ঐকমত্যে বা ‘Consensus’-এ পৌঁছাতে পারেনি। তিনি বলেন, “মিয়ানমারে তিন ধাপে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হলেও আসিয়ান এখনো একে অনুমোদন বা স্বীকৃতি দেয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের উত্তর হলো—না, এই নির্বাচন আসিয়ানের কাছে বৈধ নয়।”
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘র্যাপলার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাজারো ইঙ্গিত দিয়েছেন যে মিয়ানমারের নির্বাচন প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জোটের ভেতরে গভীর সংশয় রয়েছে।
জান্তা সমর্থিত ইউএসডিপির বিজয় দাবি ও বাস্তবতা
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর এই প্রথম দেশে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করে ‘Military Junta’। গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হয়ে তিন ধাপে চলা এই ভোটগ্রহণ শেষ হয় গত ২৫ জানুয়ারি। গত সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সামরিক বাহিনীর মদতপুষ্ট রাজনৈতিক দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (USDP) নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার দাবি করে।
সামরিক সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী মার্চ মাসে নতুন সংসদ অধিবেশন আহ্বান এবং এপ্রিল থেকে নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। তবে আসিয়ানের এই প্রত্যাখ্যান জান্তা সরকারের ‘Legitimacy’ বা বৈধতা অর্জনের চেষ্টাকে বড় ধরনের সংকটে ফেলে দিয়েছে।
প্রহসনের নির্বাচন বনাম আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ
সমালোচক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মিয়ানমারের এই নির্বাচন ছিল মূলত সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার একটি সাজানো নাটক। প্রধান বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া এবং দেশজুড়ে চলমান ‘Civil War’ বা গৃহযুদ্ধের কারণে লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার বঞ্চিত হওয়া এই নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণন এ বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “মিয়ানমারে সত্যিকারের রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্য আগে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। সব পক্ষের অংশগ্রহণে একটি ‘Inclusive Dialogue’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ অত্যন্ত জরুরি। এই শর্তগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সরকারের পক্ষেই জনগণের সমর্থন বা আন্তর্জাতিক বৈধতা পাওয়া সম্ভব নয়।”
সংকটে আসিয়ান ও মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ
বর্তমানে ফিলিপিন্স আসিয়ানের আবর্তনশীল সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে ভয়াবহ সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশটিকে আসিয়ানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো থেকে বাদ রাখা হয়েছে। যদিও মিয়ানমার জোটের ১১টি সদস্য দেশের একটি, তবুও ‘৫-দফা শান্তি পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় নেপিদোর জান্তা সরকারকে কোণঠাসা করে রেখেছে সদস্য দেশগুলো।
বিশ্লেষকদের মতে, আসিয়ানের এই সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত মিয়ানমারের সামরিক সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে থাকা জান্তা সরকারের জন্য আঞ্চলিক সমর্থন হারানো একটি বড় পরাজয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।