মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির চরম উত্তেজনা ও যুদ্ধের দামামার মধ্যেই এক টেবিলে বসতে যাচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সংঘাত এড়ানোর লক্ষ্যে আজ শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ওমানের রাজধানী মাসকাটে এই বিশেষ কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হচ্ছে। কাতার, তুরস্ক ও মিশরের সরাসরি মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই বৈঠককে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ‘শান্তির শেষ সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন। তবে আলোচনার টেবিলে বসার মুহূর্তেও দুই পক্ষের মধ্যে হুঁশিয়ারি ও পাল্টা হুঁশিয়ারি বজায় থাকায় বৈঠকের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ত্রিপক্ষীয় মধ্যস্থতা ও প্রস্তাবিত সমঝোতা কাঠামো
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বরফ গলাতে কাতার, মিশর ও তুরস্ক যৌথভাবে একটি কাঠামোগত প্রস্তাব (Framework Proposal) উত্থাপন করেছে। সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই সমঝোতায় ইরানকে আগামী তিন বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (Uranium Enrichment) সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ১.৫ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ইরানের কাছে থাকা প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিরাপদ পাহারায় তৃতীয় কোনো দেশে সরিয়ে নিতে হবে। এছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile) কর্মসূচির ওপর নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা আনার শর্তও এই খসড়া প্রস্তাবে যুক্ত করা হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান জানিয়েছেন, আঙ্কারা আপ্রাণ চেষ্টা করছে যাতে এই উত্তেজনা পুরো অঞ্চলকে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে না দেয়।
ট্রাম্পের ‘ভয়াবহ’ হুঁশিয়ারি ও খামেনির প্রতিক্রিয়া
আলোচনায় বসতে রাজি হলেও নিজের স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক মেজাজ বজায় রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে উদ্দেশ্য করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ট্রাম্পের মতে, খামেনির এখনই ‘চিন্তিত’ হওয়া উচিত। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মাসকাট বৈঠকে যদি কোনো সম্মানজনক সমঝোতা (Deal) না হয়, তবে পরিস্থিতির পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে অনেকেই সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের পরোক্ষ হুমকি হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই রক্তচক্ষুকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিতে নারাজ তেহরান। ইরানের সেনাবাহিনী সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো যুদ্ধ চায় না, তবে শত্রুপক্ষ যদি যুদ্ধের পথ বেছে নেয়, তবে তার দাঁতভাঙা জবাব দিতে ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন অস্থিরতা ও তেলের বাজার
কূটনৈতিক এই টানাপোড়েনের মধ্যেই উত্তাপ ছড়িয়েছে পারস্য উপসাগরীয় জলসীমায়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) বৃহস্পতিবার জ্বালানি পাচারের অভিযোগে দুটি বিদেশি তেলবাহী জাহাজ (Oil Tanker) জব্দ করেছে। জাহাজ দুটি কোন দেশের বা সেখানে কতজন নাবিক ছিলেন, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এই ঘটনাকে মাসকাট বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের এক ধরণের মানসিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে উত্তেজনার পারদ চড়লেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে (Oil Market)। দুই দেশ আলোচনার টেবিলে বসতে সম্মত হওয়ায় সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কিছুটা কমেছে, ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছে।
এখন বিশ্ববাসীর নজর মাসকাটের দিকে। ওমানের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক কি পারবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মেঘ সরিয়ে শান্তির আলো দেখাতে, নাকি ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি সত্যি হয়ে সংঘাতের নতুন দাবানল জ্বলবে—তার উত্তর মিলবে আজ বিকেলের মধ্যেই।