গাজা উপত্যকায় ইজরায়েলি দখলদারিত্ব বজায় থাকা পর্যন্ত কোনোভাবেই অস্ত্র সমর্পণ করবে না হামাস। ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করার বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে সংগঠনটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা খালেদ মেশাল স্পষ্ট জানিয়েছেন, আত্মরক্ষার অধিকার থেকে ফিলিস্তিনিদের বিচ্যুত করা যাবে না। কাতারের রাজধানী দোহায় আয়োজিত ‘আল জাজিরা ফোরাম’-এর দ্বিতীয় দিনে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন।
‘সহজ শিকারে’ পরিণত হতে চায় না হামাস
খালেদ মেশাল তার বক্তব্যে যুক্তি দেন যে, একটি দখলকৃত জাতিকে নিরস্ত্র করার অর্থ হলো তাদের ইজরায়েলি বাহিনীর সামনে ‘সহজ শিকারে’ (Easy Prey) পরিণত করা। তিনি বলেন, “যেখানে ইজরায়েল বিশ্বের আধুনিকতম মারণাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দখলদারিত্ব চালাচ্ছে, সেখানে নিরস্ত্র জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য আরও সহজ হয়ে পড়বে।” ফিলিস্তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধ বা Resistance-কে স্তিমিত করার প্রচেষ্টাকে তিনি শতবর্ষী এক ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা হিসেবে বর্ণনা করেন।
ট্রাম্পের হুমকি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামাসকে নিরস্ত্র করার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। ট্রাম্প সাফ জানিয়েছিলেন, হামাস যদি অস্ত্র ত্যাগ না করে তবে তাদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ‘রেটালিয়েশন’ (Retaliation) বা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ট্রাম্পের সেই হুমকির প্রেক্ষাপটে মেশাল জানান, কোনো প্রকার বাহ্যিক চাপ বা হুমকিতে তারা নতি স্বীকার করবেন না। তিনি বলেন, নিরস্ত্রীকরণের আগে গাজার পুনর্গঠন (Reconstruction) এবং মানবিক ত্রাণ সহায়তা (Humanitarian Aid) নিশ্চিত করা জরুরি।
পরোক্ষ সংলাপ ও মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা
মেশাল আরও উল্লেখ করেন যে, কাতার, তুরস্ক ও মিশরের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘ইনডাইরেক্ট ডায়ালগ’ (Indirect Dialogue) বা পরোক্ষ সংলাপে যুক্ত রয়েছেন। হামাসের দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক মহলে পরিষ্কার করা হয়েছে। তার মতে, গাজা এবং ইহুদিবাদী সত্তার মধ্যে যুদ্ধ পুনরায় শুরু না হওয়ার গ্যারান্টি প্রয়োজন, তবে সেটি ফিলিস্তিনিদের নিরস্ত্র করে অর্জন করা সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যার জন্য নিরস্ত্রীকরণ নয়, বরং প্রচুর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন।
শান্তিরক্ষী বাহিনী ও যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ
গত বছরের অক্টোবরে মার্কিন মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় পর্যায়ের একটি যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) কার্যকর হয়েছিল। সেই সময় ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, তারা ভবিষ্যতে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজায় একটি আন্তর্জাতিক ‘পিসকিপিং ফোর্স’ (Peacekeeping Force) বা শান্তি রক্ষা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে। তবে হামাস নেতার বর্তমান বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, গাজা থেকে ইজরায়েলি সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত এই প্রস্তাবগুলো কেবল আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে খালেদ মেশালের এই অনমনীয় অবস্থান গাজা সংকটের সমাধানকে আরও জটিল করে তুলল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।