ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নদীগুলোর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে এবং ভঙ্গুর স্যানিটেশন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে বড় অংকের বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসছে বিশ্বব্যাংক (World Bank)। সংস্থাটি ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ (Metro Dhaka Water Security and Resilience) শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় ৩৭০ মিলিয়ন বা ৩৭ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা অনুমোদন করেছে। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।
ওয়াশিংটন ভিত্তিক সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে নির্বাহী পরিচালকদের সভায় এই অর্থায়ন চূড়ান্ত করা হয়। মূলত দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে ঢাকার জলাশয় ও নদ-নদী যে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্যই এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
নদী ও খালের নাব্যতা ফেরাতে ‘মেগা প্রজেক্ট’
প্রকল্পটির প্রাথমিক লক্ষ্য হলো রাজধানী ঢাকা ও এর চারপাশের নদী-খালের দূষণ কমিয়ে সেগুলোর নাব্যতা এবং স্বাভাবিক পানি প্রবাহ (Flow) ফিরিয়ে আনা। এই কর্মসূচির আওতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসা (DWASA)-র প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো হবে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে উন্নত স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা থেকে বঞ্চিত, সেই এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ উন্নত স্যানিটেশন এবং ৫ লাখ মানুষ আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার (Waste Management) আওতায় আসবে।
ঢাকার পানিনিরাপত্তা: একটি ভয়াবহ চিত্র
বাংলাদেশ ও ভুটানে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর (Country Director) জঁ পেসমে এই প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “ঢাকার জলাশয়গুলো কোটি মানুষের জীবনরেখা। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ভেঙে পড়েছে, যা জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ঢাকার মাত্র ২০ শতাংশ বাসিন্দা বর্তমানে পাইপযুক্ত স্যুয়ারেজ সিস্টেম (Piped Sewerage System)-এর সুবিধা পাচ্ছেন। বাকি ৮০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য সরাসরি শহরের জলাশয় ও নদীতে গিয়ে মিশছে। এছাড়া শহরের অর্ধেকের বেশি খাল এখন হয় বিলীন হয়ে গেছে অথবা বর্জ্যে ভরাট হয়ে মৃতপ্রায়।
শিল্পবর্জ্য ও ইটিপি (ETP) ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন
দেশের মোট রফতানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানার ৮০ শতাংশই ঢাকা ও এর আশেপাশে অবস্থিত। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক তথ্য—প্রায় ৭ হাজার কারখানা প্রতিদিন ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে। এর ফলে ওই অঞ্চলের মানুষের চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও নানা স্নায়বিক সমস্যা প্রকট হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রকল্পে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা হবে এবং প্রতিটি কারখানায় কার্যকর শিল্পবর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি (Effluent Treatment Plant) স্থাপন ও পানির পুনঃব্যবহার (Water Recycling) বাড়ানোর বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ডিজিটাল মনিটরিং ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ওয়াটার স্পেশালিস্ট হর্ষ গোয়েল জানান, এই কর্মসূচিটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। প্রথম ধাপে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নির্দিষ্ট এলাকায় কাজ শুরু হবে। প্রকল্পের অন্যতম আধুনিক সংযোজন হলো ‘ডিজিটাল রিয়েল-টাইম মনিটরিং’ (Digital Real-time Monitoring), যার মাধ্যমে নদীর পানির গুণগত মান ও দূষণ মাত্রা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং রিসাইক্লিং সেক্টরকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সরাসরি নদী বা ড্রেনে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা কমিয়ে আনা হবে।
সাংবাদিকরা মনে করছেন, বিশ্বব্যাংকের এই বিশাল বিনিয়োগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে আগামী কয়েক বছরে ঢাকা একটি বসবাসযোগ্য ও পানিনিরাপদ মেগাসিটি হিসেবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।