দেশের বাজারে মূল্যবান ধাতু স্বর্ণের দামের অস্থিরতা এখন চরমে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের মাত্র ১০ দিন পার হতেই রেকর্ড ৯ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। দফায় দফায় এই উত্থান-পতনের ঝড়ে স্বর্ণের বাজারে যেমন অস্থিরতা বিরাজ করছে, তেমনি সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। এই ১০ দিনে ৯ দফা পরিবর্তনের পর প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নিট হিসেবে বেড়েছে ১ হাজার ৩৪১ টাকা।
উত্থান-পতনের অদ্ভুত সমীকরণ ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই দেশের বাজারে স্বর্ণের দামের এক অভূতপূর্ব চিত্র দেখা যাচ্ছে। ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি পর পর তিনবার দাম কমানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১ ফেব্রুয়ারি ১ হাজার ৯২৫ টাকা এবং ২ ফেব্রুয়ারি দুই দফায় যথাক্রমে ৬ হাজার ৫৯০ টাকা ও ৫ হাজার ৪২৪ টাকা কমানো হয়। এতে ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও তা স্থায়ী হয়নি।
৩ ফেব্রুয়ারি থেকেই নাটকীয়ভাবে দাম বাড়তে শুরু করে। সেদিন দুই দফায় ৫ হাজার ৪২৪ টাকা এবং ১০ হাজার ৯০৬ টাকা দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর ৬ ফেব্রুয়ারি ৭ হাজার ৬৪০ টাকা কমানো হলেও ঠিক পরের দিনই অর্থাৎ ৭ ফেব্রুয়ারি সমপরিমাণ টাকা আবার বাড়িয়ে দেওয়া হয়। একই দিন বিকেলে আবার ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমানোর ঘোষণা আসে। সর্বশেষ ৯ ফেব্রুয়ারি ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা বাড়িয়ে বর্তমানে ভরিপ্রতি স্বর্ণের বাজার দর (Market Value) নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকা।
আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব ও ‘পেপার ট্রেডিং’ দেশের বাজারে এই ঘনঘন দাম সমন্বয়ের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের (Global Market) অস্থিরতাকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা এবং স্থানীয় বাজারে সরবরাহের টানাপড়েনই এই অস্থিরতার মূল কারণ।
বাজুস সভাপতি এনামুল হক খান এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, “স্বর্ণের বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে দেশীয় কোনো প্রভাব নেই। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে স্টক করা বা কাগজে-কলমে লেনদেন তথা ‘পেপার ট্রেডিং’ (Paper Trading)-এর কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বাস্তবে কতটা ফিজিক্যাল গোল্ড (Physical Gold) বাজারে আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ভার্চুয়াল বাজার বা কাগজে-কলমে হওয়া লেনদেনই মূল দাম নির্ধারণ করছে।”
পাচার রোধ ও নিরাপদ বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ দেশের বাজারে কেন এত ঘনঘন সমন্বয় করা প্রয়োজন—এমন প্রশ্নের উত্তরে বাজুস সভাপতি জানান, এর পেছনে ব্যবসায়িক স্বার্থের চেয়েও জাতীয় স্বার্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “যদি বিশ্ববাজারের সঙ্গে দেশের দাম দ্রুত সমন্বয় করা না হয়, তবে স্বর্ণ পাচারের (Smuggling) ঝুঁকি বেড়ে যায়। দেশে দাম কম থাকলে পার্শ্ববর্তী দেশে স্বর্ণ পাচার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ব্যবসায়ীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং দেশীয় সম্পদ রক্ষা করতে আমাদের এই দ্রুত পরিবর্তন করতে হয়।”
বর্তমানে অনিশ্চিত বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বর্ণকে অনেকেই ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগ (Safe Investment) হিসেবে বিবেচনা করছেন। ফলে বিশ্বজুড়েই এই ধাতুর চাহিদা বাড়ছে। তবে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য এই ঘনঘন দাম পরিবর্তন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বিয়ের মৌসুমসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বর্ণালঙ্কার ক্রয়ের সিদ্ধান্তকে জটিল করে তুলছে।