দেশের আর্থিক খাতের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ ‘Autonomy’ বা স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার দাবিতে ফের উত্তাল হয়ে উঠেছে মতিঝিল পাড়া। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নাকচ করে দেওয়ার প্রতিবাদে বর্তমান অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০তলা ভবনের সামনে আয়োজিত এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এই নজিরবিহীন দাবি তোলা হয়।
স্বায়ত্তশাসনের লড়াই ও নীতিগত সংঘাত
প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রভাবশালী সংগঠন ‘অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল’। সমাবেশে বিভিন্ন পর্যায়ের শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আন্দোলনের মূলে রয়েছে গত বছরের অক্টোবরে পাঠানো একটি প্রস্তাবনা, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব ও স্বাধীন কার্যক্রম নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছিল। তবে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা যথাযথ প্রক্রিয়া (Due Process) অনুসরণ না করেই অর্থ মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাবনা বাতিল করে দেয়।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের ‘দ্বিমুখী’ অবস্থানে ক্ষোভ
সমাবেশে অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ অর্থ উপদেষ্টার ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন, তখন তিনি নিজেই এই আইনি সংশোধনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বৃদ্ধির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। অথচ বর্তমান সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে তিনি তার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।
মাসুম বিল্লাহ বলেন, “একজন প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নরের কাছ থেকে এমন ‘Double Standard’ বা দ্বিমুখী আচরণ অপ্রত্যাশিত। তিনি একটি চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন যে, এই সংশোধনের আর প্রয়োজন নেই। তার এই নৈতিক অবস্থানের স্খলনের প্রতিবাদে আমরা তার পদত্যাগ চাই—সেটি প্রতীকী অর্থে একদিনের জন্য হলেও।”
নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার
প্রতিবাদ সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। বক্তারা উল্লেখ করেন, বর্তমানে নির্বাচনী দৌড়ে এগিয়ে থাকা প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলই তাদের ‘Election Manifesto’ বা নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কর্মকর্তাদের দাবি, দেশের ‘Macroeconomic Stability’ বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়া জরুরি। যে দলই আগামীতে সরকার গঠন করুক না কেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ‘Central Bank Autonomy’ বাস্তবায়ন না করলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তারা।
নীতিমালা ও প্রশাসনিক টানাপোড়েন
সমাবেশে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসনিক স্বাধীনতা খর্ব হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই ‘Decision Making’ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানের ‘Regulatory Body’ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অর্ডারের আমূল সংস্কার অপরিবাচক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই নেতিবাচক সিদ্ধান্তে দেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সোমবারের এই বিক্ষোভের পর অর্থ মন্ত্রণালয় কিংবা উপদেষ্টা কার্যালয় থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্দরে শুরু হওয়া এই অসন্তোষ দেশের আর্থিক খাতে নতুন কোনো প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।