• ব্যবসায়
  • ছুটির ফাঁদে দেশের পোশাক খাত: ফেব্রুয়ারি-মার্চে মাত্র ৩৫ কর্মদিবসে গভীর সংকটে আরএমজি সেক্টর

ছুটির ফাঁদে দেশের পোশাক খাত: ফেব্রুয়ারি-মার্চে মাত্র ৩৫ কর্মদিবসে গভীর সংকটে আরএমজি সেক্টর

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
ছুটির ফাঁদে দেশের পোশাক খাত: ফেব্রুয়ারি-মার্চে মাত্র ৩৫ কর্মদিবসে গভীর সংকটে আরএমজি সেক্টর

নির্বাচন, ঈদ ও সরকারি ছুটির চাপে অনিশ্চিত শিপমেন্ট; বেতন পরিশোধ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত (RMG Sector) এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ট্যারিফ’ (Tariff) জটিলতায় ক্রয়াদেশ বা ‘অর্ডার’ কমে যাওয়ার ঝুঁকি, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘ ছুটির কবলে পড়ে থমকে যেতে বসেছে উৎপাদন প্রক্রিয়া। ক্যালেন্ডারের হিসাব অনুযায়ী, চলতি ফেব্রুয়ারি এবং আগামী মার্চ মাসে নিয়মিত সরকারি ছুটি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পবিত্র ঈদুল ফিতরের বন্ধের কারণে মাত্র ৩৫টি কর্মদিবস পাওয়া যাবে। কর্মদিবসের এই অস্বাভাবিক ঘাটতি পোশাক শিল্পের ‘সাপ্লাই চেইন’ (Supply Chain)-এ বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ছুটির হিসাব ও উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ বিজিএমইএ (BGMEA) প্রদত্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ দিনের মধ্যে মাত্র ১৬টি কার্যকর কর্মদিবস পাওয়া যাচ্ছে। ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের দুই দিনের ছুটি। এর আগে শবে বরাতের ছুটি এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবসের বন্ধ তো রয়েছেই। মার্চ মাসেও চিত্রটা প্রায় একই। ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসের পাশাপাশি পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অন্তত ৫ দিনের ছুটির সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই দুই মাসে শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য কারখানা সচল রাখা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর্থিক চাপ ও বেতন পরিশোধের শঙ্কা বিজিএমইএ-র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী এই পরিস্থিতিকে ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে প্রায় এক মাস আমাদের কাজ ছাড়াই শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে। প্রোডাকশন না থাকলেও ‘ওভারহেড কস্ট’ (Overhead Cost) কিন্তু কমছে না। অনেক কারখানার পক্ষে এই আর্থিক চাপ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকারের উচিত এখনই এই সেক্টরের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া।”

বন্দর জটিলতা ও শিপমেন্টে বিলম্ব উৎপাদন সংকটের পাশাপাশি গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের অস্থিরতা। সম্প্রতি টানা সাত দিন শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতির ফলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিদেশ থেকে আনা কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে না পারায় এবং তৈরি পোশাক সময়মতো বন্দরে পাঠাতে না পারায় ‘লিড টাইম’ (Lead Time) রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিজিএমইএ পরিচালক এমডি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “সময়মতো ‘শিপমেন্ট’ (Shipment) দিতে না পারলে বায়াররা অর্ডার বাতিল করতে পারেন অথবা বড় অঙ্কের ডিসকাউন্ট চাইতে পারেন। এটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও বায়ারদের অবস্থান বিশ্ববাজারে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো ‘কম্পিটিটর’ (Competitors) দেশগুলোর সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিজিএমইএ পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরীর মতে, নির্বাচনের কারণে বিদেশি ক্রেতারা আপাতত নতুন অর্ডার দিতে কিছুটা ধীরগতি অবলম্বন করছেন। তবে তিনি আশাবাদী যে, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে বড় ধরনের ক্রয়াদেশ বা ‘বাল্ক অর্ডার’ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় ২১০০ কারখানায় ৩৩ লাখ এবং চট্টগ্রামে ৪৬৪টি কারখানায় ১১ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন, যাঁদের জীবন-জীবিকা এখন এই খাতের টিকে থাকার ওপর নির্ভরশীল।

নিরাপত্তা নিশ্চিতে শিল্প পুলিশের বিশেষ কৌশল দীর্ঘ ছুটির সময়ে কারখানার যন্ত্রপাতি ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ তৎপরতা শুরু করেছে শিল্প পুলিশ। চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জানিয়েছেন, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কারখানায় ‘সিসিটিভি মনিটরিং’ (CCTV Monitoring) জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া থানা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষ পেট্রোলিং টিম কাজ করছে, যাতে কোনো ধরনের নাশকতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।

পোশাক খাতের এই সংকট উত্তরণে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। এখন দেখার বিষয়, মাত্র ৩৫ কর্মদিবসের এই সীমাবদ্ধতাকে জয় করে বাংলাদেশ তার শীর্ষ রপ্তানি খাতকে কতটা সফলভাবে টিকিয়ে রাখতে পারে।

Tags: bangladesh economy rmg sector supply chain garment industry bgmea news holiday crisis export shipment production loss