দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত প্রবাসী আয়ে নতুন জোয়ার দেখা দিয়েছে। নতুন বছরের শুরুতেই রেকর্ড পরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত জানুয়ারি মাসে দেশে ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার (USD) রেমিট্যান্স এসেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো একক মাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ এবং চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
শীর্ষে সৌদি আরব, সমানে সমান যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিবারের মতো এবারও রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে সৌদি আরব। জানুয়ারি মাসে সৌদি প্রবাসীরা ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ১০ হাজার ডলার পাঠিয়েছেন। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাজ্য থেকে এসেছে ৪৬ কোটি ৯৩ লাখ ২০ হাজার ডলার। এছাড়া তৃতীয় অবস্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) থেকে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩৮ কোটি ৮০ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
প্রবাসী আয়ের শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলো হলো— মালয়েশিয়া (২৮ কোটি ২ লাখ ১০ হাজার ডলার), যুক্তরাষ্ট্র (২৭ কোটি ৪৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার), ইতালি (১৮ কোটি ৮৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার), ওমান (১৮ কোটি ২০ লাখ ৭০ হাজার ডলার), কুয়েত (১৬ কোটি8৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার), সিঙ্গাপুর (১৪ কোটি ১৪ লাখ ২০ হাজার ডলার) এবং কাতার (১৩ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ডলার)।
বেসরকারি ব্যাংকের জয়জয়কার, পিছিয়ে নেই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো রেমিট্যান্স প্রবাহের এই বিশাল অঙ্কের সিংহভাগই এসেছে দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর (Private Commercial Banks) মাধ্যমে। তথ্যমতে, বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ২২৯ কোটি ৪৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সংগৃহীত হয়েছে ৪৬ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। এছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৪০ কোটি ১০ লাখ ৬০ হাজার ডলার এবং বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৫৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের রেট বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের সচেতনতা বাড়ায় বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর এই প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ভাঙছে একের পর এক রেকর্ড: স্থিতিশীলতার পথে অর্থনীতি গত কয়েক মাস ধরেই রেমিট্যান্স প্রবাহে উর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরু থেকেই একের পর এক রেকর্ড গড়ছে প্রবাসী আয়। এর আগে গত ডিসেম্বর মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার, যা দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এছাড়া গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়ে প্রবাসীরা ইতিহাসের সেরা রেকর্ড গড়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি এবং হুন্ডি প্রতিরোধের নানামুখী উদ্যোগের সুফল মিলছে এখন। এই বিপুল পরিমাণ ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনফ্লো (Foreign Exchange Inflow) দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে (Forex Reserve) শক্তিশালী করার পাশাপাশি ডলার সংকটের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও প্রবাসীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অবদান দেশের ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি বা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে।