ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ শেষে যখন দেশজুড়ে জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ চলছে, ঠিক তখন মেহেরপুর থেকে এলো রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সম্প্রীতির এক বিরল দৃশ্য। ভোটের ময়দানে একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সত্ত্বেও, ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর কোলাকুলি এবং মিষ্টিমুখ করানোর ঘটনাটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। মেহেরপুর-১ (সদর ও মুজিবনগর) আসনের এই চিত্রকে দেশের আগামীর 'Political Culture' বা রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক বিবর্তন হিসেবে দেখছেন সাধারণ নাগরিকরা।
বিজয়ীর সৌজন্য: পরাজিত প্রার্থীর দুয়ারে তাজউদ্দিন খান
বৃহস্পতিবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষিত হওয়ার পর এক অভাবনীয় মুহূর্তের সাক্ষী হয় মেহেরপুর। জয়ের স্বাদ পাওয়ার পরপরই জামায়াত মনোনীত বিজয়ী প্রার্থী তাজউদ্দিন খান সশরীরে হাজির হন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা মাসুদ অরুণের কার্যালয়ে। সেখানে কোনো তিক্ততা নয়, বরং দুই নেতার মধ্যে বিনিময় হয় উষ্ণ অভিনন্দন ও কুশলাদি।
বিজয়ী প্রার্থী তাজউদ্দিন খান নিজেই মাসুদ অরুণকে মিষ্টিমুখ করান, যা উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে এক আবেগঘন ও আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করে। মাসুদ অরুণও হাসিমুখে তাকে স্বাগত জানান এবং জয়ের জন্য অভিনন্দন জানান। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের বাইরেও 'Social Co-existence' বা সামাজিক সহাবস্থান সম্ভব।
জনমতের রায়: ভোটের পরিসংখ্যান
মেহেরপুর-১ আসনে এবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত জনমতের পাল্লা ভারী ছিল তাজউদ্দিন খানের দিকে। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, জামায়াত মনোনীত প্রার্থী তাজউদ্দিন খান পেয়েছেন ২,২১,১৬১ ভোট। তার বিপরীতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাসুদ অরুণ পেয়েছেন ১,০৪,৭৬৮ ভোট। বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েও তাজউদ্দিন খান তার বক্তব্যে মাসুদ অরুণের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।
উন্নয়নের প্রশ্নে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার অঙ্গীকার
মিষ্টিমুখ পর্ব শেষে দুই নেতাই মেহেরপুরের সামগ্রিক উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। মাসুদ অরুণ জানান, মেহেরপুরের মানুষের প্রয়োজনে তিনি সবসময় সংসদ সদস্যের পাশে থাকবেন। অন্যদিকে তাজউদ্দিন খান বলেন, "ভোট একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, কিন্তু এলাকার উন্নয়ন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আমরা বিভেদ ভুলে মেহেরপুরকে একটি আদর্শ জেলায় রূপান্তর করতে চাই।"
এই সৌজন্য সাক্ষাতের সময় সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইকবাল হুসাইন, পলিটিক্যাল সেক্রেটারি রুহুল আমিন, পৌর জামায়াতের সভাপতি সোহেল রানা ডলার এবং সাবেক পৌর বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেনসহ উভয় দলের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসার জোয়ার
ফেসবুক ও এক্স-এর মতো প্ল্যাটফর্মে এই দুই নেতার ছবি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। নেটিজেনরা একে 'বিউটি অফ ডেমোক্রেসি' বা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে বর্ণনা করছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মেহেরপুরের এই উদাহরণ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও রাজনৈতিক সহিংসতা কমিয়ে 'Peaceful Transition' নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন 'Healthy Competition' বা সুস্থ প্রতিযোগিতা ফিরে আসায় মেহেরপুরের সাধারণ মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা প্রত্যাশা করছেন, এই সম্প্রীতির ধারা কেবল নির্বাচনের রাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে আগামীর পথচলাতেও বিদ্যমান থাকবে।