• দেশজুড়ে
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় তুঙ্গে, ব্যালট বাক্সে শূন্য: ত্রয়োদশ নির্বাচনে আলোচিত হার যাদের

সোশ্যাল মিডিয়ায় তুঙ্গে, ব্যালট বাক্সে শূন্য: ত্রয়োদশ নির্বাচনে আলোচিত হার যাদের

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
সোশ্যাল মিডিয়ায় তুঙ্গে, ব্যালট বাক্সে শূন্য: ত্রয়োদশ নির্বাচনে আলোচিত হার যাদের

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী থেকে সারজিস আলম—ভার্চুয়াল জগতের ‘ভাইরাল’ জোয়ার আর মাঠের উত্তাপ সত্ত্বেও সংসদ সদস্য হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়লেন একঝাঁক আলোচিত মুখ; কেন জনসমর্থন ভোটে রূপান্তর হলো না?

গণতন্ত্রের উৎসবে জনতা তাদের রায় দিয়ে দিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে একটি চমকপ্রদ তথ্য সামনে আসছে—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ‘সোশ্যাল মিডিয়া’র জনপ্রিয়তাই যে শেষ কথা নয়, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। নির্বাচনের প্রচারকালে যেসব প্রার্থী টক অব দ্য কান্ট্রি (Talk of the country) ছিলেন এবং যাদের প্রতিটি বক্তব্য ভার্চুয়াল জগতে ‘ভাইরাল’ (Viral) হয়েছে, তাদের একটি বড় অংশই ব্যালট যুদ্ধের চূড়ান্ত লড়াইয়ে হোঁচট খেয়েছেন।

ঢাকা-৮: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ‘ভাইরাল’ প্রচার ও পরাজয়

নির্বাচনী প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি ‘ডিজিটাল ডিসকোর্স’ (Digital Discourse) তৈরি করেছিলেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও এনসিপির (NCP) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ঢাকা-৮ আসন থেকে লড়া এই তরুণ নেতা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হেভিওয়েট প্রার্থী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে নিয়ে করা নানা মন্তব্যের কারণে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। ফেসবুক-ইউটিউবে তাঁর জয়গান চললেও ভোটের হিসেবে তিনি মির্জা আব্বাসের অভিজ্ঞ রাজনীতির কাছে পরাজিত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ‘সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন’ (Social Media Campaign) আর তৃণমূলের ‘ভোট ব্যাংক’—এর মধ্যে যে বড় ব্যবধান রয়েছে, পাটওয়ারীর পরাজয় তারই প্রতিফলন।

ঢাকা-৯: ডা. তাসনিম জারার স্বতন্ত্র লড়াই

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে চমক দিয়েছিলেন জনপ্রিয় চিকিৎসক ও ভ্লগার ডা. তাসনিম জারা। শুরুতে এনসিপিতে যোগ দিলেও জোটের আদর্শগত দ্বন্দ্বে দল ত্যাগ করে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েন তিনি। পেশাগত পরিচিতি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লাখ লাখ অনুসারী থাকা সত্ত্বেও সংসদীয় আসনের ভোট সমীকরণে তিনি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি।

ঢাকা-১৩ ও বরিশাল-৫: মামুনুল হক ও মনীষা চক্রবর্তীর হার

দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে আলোচিত ব্যক্তিত্ব খেলাফত মজলিস নেতা মাওলানা মামুনুল হক ঢাকা-১৩ আসনে পরাজিত হয়েছেন। তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ববি হাজ্জাজ এখানে জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে, বরিশালের রাজপথের পরিচিত মুখ এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে সবসময় আলোচনায় থাকা বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তীও বরিশাল-৫ আসনে ভোটারদের মন জয় করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর এই পরাজয় বামপন্থি রাজনীতির ভোট হ্রাসের ধারার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

খুলনা ও উত্তরের সমীকরণ: গোলাম পরওয়ার ও সারজিস আলম

খুলনা-৫ আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর হেরে গেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিএনপির মোহাম্মদ আলি আসগার লবির কাছে মাত্র ২ হাজার ৭০২ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন তিনি। অন্যদিকে, খুলনা-১ আসনে জামায়াতের ‘হিন্দু শাখা’র নেতা হিসেবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়া কৃষ্ণ নন্দীও বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।

সবচেয়ে বড় চমক ছিল পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের হার। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম এই সমন্বয়ক মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও সংসদীয় রাজনীতির ‘ইলেক্টোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ (Electoral Engineering)-এ সুবিধা করতে পারেননি।

সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ: ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তা বনাম গ্রাসরুট রিয়ালিটি

এই আলোচিত প্রার্থীদের পরাজয় একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা দেয়। বর্তমান সময়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর’ (Content Creator) বা আন্দোলনকারী নেতাদের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ (Brand Value) থাকলেও, সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে গেলে যে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো এবং তৃণমূল পর্যায়ের সংযোগ প্রয়োজন, সেখানে এই নতুনেরা পিছিয়ে ছিলেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যারা সরব, তারা কি কেবল একটি বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন? এই প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের টেবিলে। ব্যালট বক্স প্রমাণ করল যে, ‘পাবলিক সেন্টিমেন্ট’ (Public Sentiment) আর ‘পাবলিক ভোট’—দুটি সব সময় এক পথে চলে না।

Tags: national election social media sarjis alam bangladesh politics tasnim jara mirza abbas political analysis election results bnp win viral candidates ncp loss ballot box