শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতির জাল বিস্তার করতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে গেলেন এক সাবেক স্কুল শিক্ষক। রংপুরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অঞ্চলের উপ-পরিচালককে ৮ লাখ টাকা ঘুষ (Bribery) দিতে এসে আটক হয়েছেন মাইদুল ইসলাম নামে ওই ব্যক্তি। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটে মাউশি’র রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ে। অভিযুক্ত মাইদুল কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার কচাইকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং স্থানীয় কচাইকাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা।
বিস্কুটের কার্টনে টাকার স্তূপ: যেভাবে ধরা পড়লেন মাইদুল ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, সোমবার দুপুরে মাউশির উপ-পরিচালক রোকসানা বেগমের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন মাইদুল ইসলাম। তার হাতে ছিল উপহারের মতো মোড়ানো একটি বিস্কুটের কার্টন। তবে উপহার নয়, সেই কার্টনের ভেতরে ছিল নগদ ৭ লাখ টাকা। এছাড়া তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ‘বিকাশ’ (bKash) অ্যাকাউন্টে ছিল আরও ১ লাখ টাকা।
শিক্ষা কর্মকর্তা রোকসানা বেগম জানান, মাইদুল একটি চিরকুট বা মেসেজের মাধ্যমে তাঁকে জানান যে, চারজন শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওভুক্তির (MPO Enlistment) কাজের বিনিময়ে তিনি এই অর্থ নিয়ে এসেছেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে কৌশলে অফিসের অন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ডাকেন উপ-পরিচালক। এরপর দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC) ও পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তারা এসে মাইদুলকে নগদ অর্থসহ আটক করে।
এমপিওভুক্তির অবৈধ আবদার ও আইনি জটিলতা তদন্তে জানা গেছে, রৌমারীর কচাইকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারীকে অবৈধভাবে এমপিওভুক্ত করার তদবির নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে ঘুরছিলেন মাইদুল। গত ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রথমবার উপ-পরিচালকের সঙ্গে দেখা করেন। সে সময় রোকসানা বেগম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ওই চারজনের নিরবচ্ছিন্ন অনলাইন জরিপে (Online Survey) তথ্য না থাকায় সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী তাদের সুপারিশ করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই। কিন্তু আইনের পথে না হেঁটে দুর্নীতির মাধ্যমে শর্টকাট (Shortcut) পথ বেছে নিতে গিয়েই বিপাকে পড়েন এই সাবেক শিক্ষক।
দুদক ও পুলিশের কঠোর অবস্থান ঘটনার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক মাউশি কার্যালয়ে উপস্থিত হন দুর্নীতি দমন কমিশনের (ACC) রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শাওন মিয়া। তিনি সাংবাদিকদের জানান, “মাইদুল ইসলাম বিস্কুটের কার্টনে করে ৭ লাখ টাকা নিয়ে এসেছিলেন। আমাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘুষ দেওয়ার চেষ্টার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।”
রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহজাহান আলী জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিকে থানায় নেওয়া হয়েছে এবং জব্দকৃত টাকা ও মোবাইল ফোন আলামত হিসেবে রাখা হয়েছে।
অপরাধ স্বীকার ও অনুশোচনা আটক মাইদুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করে বলেন, “আমি জানতাম না যে ম্যাডাম ঘুষ নেন না। আমাকে একজন পরামর্শ দিয়েছিল যে টাকা দিলে কাজ হতে পারে। ৪ জনের কাজের জন্য আমি ৮ লাখ টাকা নিয়ে এসেছিলাম। টাকা দিতে চাওয়াটা আমার ভুল হয়েছে, এখন জেল হলে হোক।”
এই ঘটনাটি রংপুরের শিক্ষা মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এমন সততা ও নৈতিক দৃঢ়তা যেমন প্রশংসিত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষকতার মতো মহান পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকা ব্যক্তির এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।