যশোরের শার্শায় গ্রাম্য চিকিৎসক আলামিন হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে শুরু করেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় ৩ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। চাকরিচ্যুত এক পুলিশ সদস্যসহ মোট ৫ জনকে আসামি করে শার্শা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের পরিবারের দাবি, এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মূলে রয়েছে ব্যক্তিগত আক্রোশ ও দ্বিতীয় বিয়ে সংক্রান্ত বিরোধ।
তদন্তের জালে ৩ গ্রেফতার: নেপথ্যে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সমীকরণ শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে নিহতের ভাই মিল্লুর রহমানের দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে পুলিশ নাভারণ-দক্ষিণ বুরুজবাগান এলাকার তিনজনকে গ্রেফতার করে। ধৃতরা হলেন— আবুল হোসেনের ছেলে আলাল হোসেন, জামির হোসেনের ছেলে লালন হোসেন এবং আব্দুল কাদেরের ছেলে সেলিম মিয়া।
তবে এই গ্রেফতার নিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। শার্শা থানা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহীর দাবি করেছেন, ধৃত তিনজনই স্থানীয় ফার্মেসি ব্যবসায়ী এবং তাঁর দলের কর্মী। এর আগে হাসপাতাল সংক্রান্ত একটি বিরোধে আলামিন এই তিনজনের নামে থানায় অভিযোগ করেছিলেন, যার জেরেই পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করেছে বলে তাঁর ধারণা। তিনি প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করলেও ধৃতদের নির্দোষ বলে দাবি করেছেন।
** Dismissed Police Member: খুনের প্রধান মাস্টারমাইন্ড?** মামলার প্রধান আসামি হিসেবে নাম এসেছে মশিউর রহমানের, যিনি বাংলাদেশ পুলিশের একজন কনস্টেবল ছিলেন। জানা গেছে, আলামিনের দ্বিতীয় স্ত্রী তাসলিমা খাতুন এবং মশিউর— উভয়েই পুলিশে কর্মরত থাকাকালীন কয়েক কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে 'Job Dismissal' বা চাকরিচ্যুতির শিকার হন। মশিউরের কারাবাসের সময় তাসলিমা তাঁকে ছেড়ে আলামিনকে বিয়ে করেন। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এই ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকেই আলামিনকে হত্যার পরিকল্পনা বা ‘Criminal Conspiracy’ করা হতে পারে। বর্তমানে মশিউর পলাতক রয়েছেন।
সেই কালরাত: নামাজ শেষে ফেরার পথে নির্মমতা গত বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে তারাবির নামাজ শেষ করে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন আলামিন। পথে গাতিপাড়া গ্রামের কাছে দুর্বৃত্তরা তাঁর গতিপথ রোধ করে এবং অতর্কিতে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই ‘Crime Scene’ সাজানো হয়েছিল বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দাফন নিয়ে উত্তেজনা ও পুলিশের ভূমিকা গ্রেফতারকৃতদের স্বজনরা আলামিনের মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং তাঁদের কঠোর নিরাপত্তায় দাফন সম্পন্ন হয়। শার্শা থানার ওসি (তদন্ত) শাহ আলম জানান, "আলামিনের দ্বিতীয় বিয়ে এবং পূর্বশত্রুতা— এই দুটি দিককে সামনে রেখেই ‘Police Investigation’ চলছে। মামলার প্রধান আসামিকে ধরতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।"
বিলাপ করছেন বৃদ্ধ পিতা নিহত আলামিনের বৃদ্ধ পিতা রফিকুল ইসলাম শোকে মুহ্যমান। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে তিনি দিশেহারা। তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে প্রশাসনের কাছে আর্জি জানিয়েছেন, যেন তাঁর ছেলের হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হয় এবং প্রকৃত দোষীরা আইনের হাত থেকে রেহাই না পায়।
দক্ষিণবঙ্গের এই জনপদে একজন চিকিৎসকের এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, পুলিশ কত দ্রুত পলাতক মূল আসামিকে আইনের আওতায় আনতে পারে।