ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং ইরানের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক উত্তেজনা এবার চরম সংঘাতের রূপ নিয়েছে। ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (IRGC)-কে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ‘সন্ত্রাসী’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে তেহরান। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে ইইউভুক্ত দেশগুলোর সব নৌ ও বিমান বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে ইরান।
পাল্টা পদক্ষেপ: আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তকে একটি ‘পারস্পরিক ও সমানুপাতিক’ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ইরানের দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ‘অবৈধ ও অযৌক্তিক’ এবং এটি জাতিসংঘ সনদ (UN Charter) ও আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থি। তেহরানের মতে, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর অংশকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা বৈশ্বিক আইনি কাঠামোর চরম লঙ্ঘন।
২০১৯ সালের আইন ও সংসদীয় বাধ্যবাধকতা
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানের পার্লামেন্টে ২০১৯ সালের এপ্রিলে পাস হওয়া একটি বিশেষ আইনের ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, তৎকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আইআরজিসি-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করলে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এই আইন প্রণয়ন করেছিল। ওই আইনের সপ্তম ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো দেশ বা জোট যুক্তরাষ্ট্রের ওই পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, তবে ইরান সরকার তাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের ‘Counter-terrorism’ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য।
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বিদেশি উসকানি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন মূলত ইরানে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া অস্থিরতা ও বিক্ষোভ দমনে আইআরজিসি-র ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ভিন্ন। তেহরানের দাবি, গত জানুয়ারি মাসে অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে হওয়া শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভগুলোকে ‘বিদেশ-সমর্থিত’ দাঙ্গাকারীরা সহিংসতায় রূপ দিয়েছিল।
ইরানের গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, রাজতন্ত্রপন্থি গোষ্ঠী এবং মার্কিন-ইসরাইলি Intelligence Agency-গুলোর সরাসরি উসকানিতে ক্লিনিক, অ্যাম্বুলেন্স ও সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। এই অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির পেছনে পশ্চিমা মদদপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আর্থিক ও মিডিয়া সহায়তা ছিল বলে দাবি ইরানের।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ও বর্তমান সমীকরণ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্তের ফলে আইআরজিসি এখন থেকে জোটটির কঠোর ‘Sanctions’ বা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। এর ফলে সদস্য দেশগুলোতে আইআরজিসি-র সব তহবিল ও আর্থিক সম্পদ জব্দ করা হবে এবং ইউরোপীয় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই বাহিনীর সঙ্গে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক বা অর্থনৈতিক লেনদেন করতে পারবে না। বর্তমানে ইইউ-র এই বিশেষ তালিকায় ১৩ জন ব্যক্তি এবং ২৩টি সংস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় মধ্যপ্রাচ্য
আইআরজিসি এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘হস্তক্ষেপমূলক নীতি’র বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পাল্টা ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত ইউরোপীয় সামরিক বাহিনীর জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় নৌ-চলাচল ও সামরিক মহড়ার ক্ষেত্রে এক নতুন ধরনের ‘Geopolitical’ অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।