• জাতীয়
  • জ্বলছে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল: বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঢাকা দক্ষিণ, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে লাখো মানুষ

জ্বলছে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল: বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঢাকা দক্ষিণ, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে লাখো মানুষ

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
জ্বলছে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল: বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঢাকা দক্ষিণ, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে লাখো মানুষ

কয়েকদিন ধরে জ্বলছে দক্ষিণ সিটির সবচেয়ে বড় বর্জ্য স্তূপ; ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে মতিঝিল পর্যন্ত। ফায়ার সার্ভিসের হিমশিম দশা, ডিজিটাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (DSCC) সবচেয়ে বড় বর্জ্য সংগ্রহের কেন্দ্র মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল এখন বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে এখানকার বিশাল ময়লার পাহাড়ে জ্বলতে থাকা আগুন স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনে নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে। বাতাসের মান দ্রুত অবনতি হওয়ায় ডেমরা, কোনাপাড়া ও যাত্রাবাড়ী ছাড়িয়ে এই বিষাক্ত ধোঁয়া এখন রাজধানীর বাণিজ্যিক কেন্দ্র মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বর্জ্য পোড়া উৎকট গন্ধ আর ধোঁয়ায় এক অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে ঢাকা দক্ষিণের একটি বিশাল জনপদে।

বিষাক্ত ধোঁয়ায় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশাল ল্যান্ডফিলের বিভিন্ন পয়েন্টে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, এই ধোঁয়ার কারণে ঘরে টেকাই দায় হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট (Respiratory problems), চোখ জ্বালাপোড়া এবং মারাত্মক কাশির প্রকোপ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "নিশ্বাস নিতে গেলে মনে হয় ফুসফুসে আগুন ঢুকে যাচ্ছে। সারাদিন এই ধোঁয়ার মধ্যে আমরা কীভাবে বাঁচব? কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।"

আগুন নেভাতে হিমশিম খাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস

ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও বিশাল আয়তনের এই ময়লার স্তূপ পুরোপুরি নির্বাপণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা জানিয়েছেন, আগুন ময়লার স্তূপের অনেক গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে, যা বাইরে থেকে পানি দিয়ে নেভানো প্রায় অসম্ভব। ময়লার পাহাড়ে মিথেন গ্যাসের উপস্থিতির কারণে আগুন বারবার জ্বলে উঠছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি নেভাতে কত সময় লাগবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সংকটের গভীরতা

তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন প্রায় ৭,৫০০ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ বর্জ্যই সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ড্রেন, খাল কিংবা উন্মুক্ত জলাশয়ে মিশছে। মাতুয়াইলের মতো ল্যান্ডফিলগুলোতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বর্জ্য শোধন না করে কেবল স্তূপ করে রাখায় তা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ‘টাইম বোম’ হিসেবে কাজ করছে।

সমাধান: ওয়েস্ট টু ওয়েলথ ও ডিজিটালাইজেশন

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রথাগত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দিয়ে ঢাকার এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। মিশন গ্রিন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি বলেন, "বর্জ্যকে এখন আর ‘West’ বা আবর্জনা হিসেবে নয়, বরং ‘Wealth’ বা সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উন্নত বিশ্বে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন (Waste-to-Energy) এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরির মাধ্যমে ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ কমানো হচ্ছে। বাংলাদেশেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় Digitalization এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।"

তিনি আরও যোগ করেন, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলার জন্য কড়া জরিমানার বিধান এবং নাগরিকদের সচেতন করতে বড় ধরনের প্রচারণার কোনো বিকল্প নেই।

সমন্বিত উদ্যোগের আশ্বাস কর্তৃপক্ষের

বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, "বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা একটি Integrated বা সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছি। তবে কেবল সিটি করপোরেশন নয়, নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আধুনিক বর্জ্য পৃথকীকরণ (Waste Segregation) এবং শোধনাগার নির্মাণের মাধ্যমে আমরা এই সংকট স্থায়ীভাবে সমাধানের চেষ্টা করছি।"

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের এই অগ্নিকাণ্ড ঢাকাবাসীর জন্য একটি সতর্কবার্তা। দ্রুত বৈজ্ঞানিক উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তি বা AI ভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু না করলে অদূর ভবিষ্যতে রাজধানীর পরিবেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

Tags: fire service health risk environmental crisis waste management dhaka pollution matuail landfill dscc news toxic smoke