কুখ্যাত ‘মাদক সম্রাট’ (Drug Lord) এল মেনচো নিহতের জেরে নজিরবিহীন সহিংসতার সাক্ষী হলো মেক্সিকো। কয়েকদিনের লাগামহীন তাণ্ডবের পর অবশেষে ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশটিতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া টহল ও নিশ্ছিদ্র নজরদারির মধ্যেই পুনরায় খুলতে শুরু করেছে স্কুল, কলেজ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ফিরতে শুরু করেছেন পর্যটকরাও, তবে দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী ‘নারকো-ভায়োলেন্স’ (Narco-violence) থেকে সৃষ্ট আতঙ্ক এখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সাধারণ বাসিন্দাদের।
ধ্বংসলীলার ক্ষত কাটিয়ে স্বাভাবিক ছন্দে মেক্সিকো
গত রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) এক ঝটিকা সামরিক অভিযানে নিহত হন মেক্সিকোর সবচেয়ে শক্তিশালী ড্রাগ কার্টেল ‘সিজেএনজি’-র (CJNG) প্রধান এল মেনচো। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই মেক্সিকোজুড়ে আগ্নেয়গিরির মতো সহিংসতা ফেটে পড়ে। অন্তত ২০টি অঙ্গরাজ্যে কার্টেল সদস্যরা সড়ক অবরোধ, শত শত যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং বিপণিবিতানগুলোতে হামলা চালায়। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারান।
তবে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করেছে। দেশটির প্রধান শহরগুলোতে আংশিকভাবে সচল হয়েছে অর্থনৈতিক কার্যক্রম। রাজপথে ভারী অস্ত্রের সজ্জায় সেনাসদস্যদের টহল দিতে দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফেরানোর চেষ্টা মাত্র।
কারাগারে শীর্ষ সহযোগীরা, জারি কড়া নজরদারি
মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এল মেনচোর দুই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দেহরক্ষীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁদের বিশেষ নিরাপত্তায় আলমোলোয়া দে জুয়ারেজের কুখ্যাত ফেডারেল কারাগারে (Federal Prison) স্থানান্তর করা হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র বহন ও মাদক পাচারের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতের নির্দেশে ‘প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন’ (Pre-trial Detention) কার্যকর করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রধান সড়কগুলো থেকে কার্টেল সদস্যদের অবরোধ সরিয়ে নেওয়া হলেও সম্ভাব্য চোরাগোপ্তা হামলা ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল অব্যাহত রাখা হয়েছে।
ট্রাম্প-শেইনবাউম ফোনালাপ ও মার্কিন গোয়েন্দা সহযোগিতা
মেক্সিকোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম এক গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপে অংশ নেন। এই অভিযানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্যের (Intelligence) জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান শেইনবাউম।
শেইনবাউম সাংবাদিকদের বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেক্সিকোর বর্তমান পরিস্থিতি এবং অভিযানের খুঁটিনাটি জানতে চেয়েছিলেন। আমি তাঁকে জানিয়েছি যে, দুই দেশের গোয়েন্দা তথ্যের সঠিক সমন্বয় ও যৌথ প্রচেষ্টার ফলেই এই কুখ্যাত অপরাধীকে নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে।” উল্লেখ্য, এল মেনচোর মাথার দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার ঘোষণা করে রেখেছিল ওয়াশিংটন। সহিংসতার জেরে মার্কিন নাগরিকদের জন্য জারি করা সতর্কবার্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় আপাতত প্রত্যাহার করে নিয়েছে হোয়াইট হাউস।
কাটেনি ভয়, অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে সাধারণ মানুষের
পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। সাধারণ মেক্সিকানদের চোখে-মুখে এখনও শঙ্কার ছাপ স্পষ্ট। কার্টেল সদস্যদের পাল্টা প্রতিশোধের ভয়ে অনেক পরিবার ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা গণমাধ্যমকে বলেন, “জীবন থেমে থাকবে না ঠিকই, কিন্তু রাস্তায় বের হলে কখন কী হয় সেই ভয় সবসময় থাকে। কখন আমাদের দৌড়ে পালাতে হবে বা লুকিয়ে পড়তে হবে, কেউ জানে না।”
আরেক কর্মজীবী নারীর কন্ঠে শোনা গেল অনিশ্চয়তার সুর। তিনি বলেন, “আমাদের অফিস খুলেছে, কাজে ফিরছি; কিন্তু সামনে কী ভয়াবহতা অপেক্ষা করছে তা নিয়ে আমরা চরম অনিশ্চয়তায় আছি।” বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এল মেনচোর মৃত্যু মেক্সিকোর মাদক বিরোধী যুদ্ধে একটি বড় জয় হলেও, কার্টেলের উত্তরাধিকারী দ্বন্দ্ব (Succession War) ভবিষ্যতে আরও রক্তক্ষয়ী হতে পারে।