বিশ্ব রাজনীতির নীতি-নির্ধারক এবং গ্লোবাল এলিটদের (Global Elite) মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত ‘দাভোস ফোরাম’ এক বড়সড় ধাক্কা খেল। সংস্থাটির আয়োজক বডি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) প্রধান বোরগে ব্রেন্দে অবশেষে তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। আমেরিকার প্রয়াত দণ্ডিত শিশু যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে যে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তার জেরেই আজ বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
সংকটে দাভোসের ভাবমূর্তি ও ব্রেন্দের পদত্যাগ
নরওয়ের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোরগে ব্রেন্দে সাড়ে আট বছর ধরে সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এক বিবৃতিতে ব্রেন্দে বলেন, তিনি দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর পদত্যাগের এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’ যেন কোনো প্রকার বিভ্রান্তি বা বাহ্যিক নেতিবাচক প্রভাব ছাড়াই তার লক্ষ্যপূরণে কাজ করে যেতে পারে, সেজন্যই তাঁর সরে যাওয়া প্রয়োজন। সাড়ে আট বছরের এই অভিজ্ঞতাকে তিনি তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারি ও মার্কিন বিচার বিভাগের নথি
সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) জেফরি এপস্টেইন সংশ্লিষ্ট তদন্তের অংশ হিসেবে এক বিশাল নথি প্রকাশ করে। সেখানে বিশ্বের বহু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদের নামের পাশাপাশি বোরগে ব্রেন্দের নামও একাধিকবার উঠে আসে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই সংস্থার ভেতরে-বাইরে তাঁর ‘এপস্টেইন সংযোগ’ খতিয়ে দেখতে একটি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট রিভিউ’ বা স্বাধীন পর্যালোচনার দাবি ওঠে। যদিও ডাব্লিউইএফ (WEF) জানিয়েছে, নথিতে নাম থাকা মানেই সরাসরি কোনো অপরাধে লিপ্ত হওয়া নয় এবং পর্যালোচনায় নতুন কোনো উদ্বেগের বিষয় পাওয়া যায়নি, তবুও নৈতিক অবস্থান থেকে ব্রেন্দের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
নৈশভোজ থেকে ইমেইল: যেভাবে শুরু যোগাযোগ
চলতি মাসের শুরুতে ব্রেন্দে নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, ২০১৮ সালে নিউইয়র্ক সফরের সময় নরওয়ের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী তেরিয়ে রড লারসেনের মাধ্যমে তিনি জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে পরিচিত হন। সে সময় এপস্টেইনকে একজন সাধারণ মার্কিন বিনিয়োগকারী (Investor) হিসেবে তাঁর কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০১৯ সালে আরও দুটি নৈশভোজে এবং কয়েকটি ইমেইল ও বার্তার মাধ্যমে তাঁদের যোগাযোগ বজায় ছিল। ব্রেন্দের দাবি, এপস্টেইনের অন্ধকার অতীত ও ভয়াবহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না। তিনি এই ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে স্বীকার করেছেন যে, এপস্টেইনের অতীত সম্পর্কে তাঁর আরও গভীরভাবে খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল।
দাভোসের নতুন নেতৃত্ব ও এপস্টেইনের নেপথ্য গল্প
বোরগে ব্রেন্দের আকস্মিক পদত্যাগের পর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থায়ী কোনো উত্তরসূরি বা পার্মানেন্ট লিডার (Permanent Leader) খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলোইস জভিংগিকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, জেফরি এপস্টেইন ছিলেন একজন আলোচিত মার্কিন ধনাঢ্য ব্যক্তি, যিনি ২০০৮ সালে নাবালিকাকে যৌন ব্যবসায় যুক্ত করার অপরাধে প্রথমবার কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে শিশু ও নারী পাচারের (Sex Trafficking) অভিযোগে পুনরায় আটক হওয়ার পর জেলখানায় রহস্যজনকভাবে আত্মহত্যা করেন তিনি। তাঁর এই বিশাল ‘সেক্স ট্রাফিকিং রিং’-এর সঙ্গে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম জড়িয়ে যাওয়ায় বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বোরগে ব্রেন্দের মতো হাই-প্রোফাইল নেতার পদত্যাগ দাভোস সম্মেলনের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিল। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মতো একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মের প্রধানের পদত্যাগ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।