দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি। মাত্র ১১ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে একবার দাম বাড়ানোর পর রাতে পুনরায় এক বিজ্ঞপ্তিতে ভরিতে আরও ৩ হাজার ২৬৬ টাকা বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। এর ফলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৬৮ হাজার ৬৮০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
নতুন দাম ও ক্যাটাগরি বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রোববার (১ মার্চ) থেকে নতুন এই দাম কার্যকর হবে। বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে ‘তেজাবি স্বর্ণ’ বা পিওর গোল্ডের (Pure Gold) সরবরাহ সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে (International Market) ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই সমন্বয় করা হয়েছে।
নতুন তালিকা অনুযায়ী স্বর্ণের মূল্যমান:
২২ ক্যারেট: ২ লাখ ৬৮ হাজার ৬৮০ টাকা (ভরি প্রতি)।
২১ ক্যারেট: ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৩৩ টাকা।
১৮ ক্যারেট: ২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকা।
সনাতন পদ্ধতি: ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৫৯ টাকা।
উল্লেখ্য, একই দিন (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৪১৪ টাকা করা হয়েছিল, যা ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু দিন শেষ হওয়ার আগেই পুনরায় দাম বাড়ানোর ঘোষণায় ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ক্রয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ (VAT ও মজুরি) বাজুস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, নির্ধারিত এই দামের সঙ্গে সরকারিভাবে নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট (VAT) প্রদান বাধ্যতামূলক। এছাড়া গহনা তৈরির ক্ষেত্রে বাজুস নির্ধারিত সর্বনিম্ন ৬ শতাংশ মজুরি (Labor Cost) যুক্ত করতে হবে। তবে নকশার জটিলতা ও মানভেদে মজুরির তারতম্য হতে পারে। ফলে একজন সাধারণ ক্রেতাকে এক ভরি গহনা কিনতে হলে প্রায় ৩ লাখ টাকার কাছাকাছি গুনতে হতে পারে।
ঘন ঘন দাম পরিবর্তনের পরিসংখ্যান স্বর্ণের বাজারে বর্তমানে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মোট ৩৪ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ১২ বার কমানো হয়েছে। তুলনা করলে দেখা যায়, গত ২০২৫ সালে মোট ৯৩ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪ বারই ছিল বৃদ্ধির খবর। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের বিনিময় হার এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা (Geopolitical Tension) স্বর্ণের এই আকাশচুম্বী দামের প্রধান কারণ।
রুপার দামেও বড় বৃদ্ধি স্বর্ণের সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রুপার দামও। এবার ভরিতে ১১৬ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম ৬ হাজার ৯৯৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ২১ ক্যারেট ৬ হাজার ৭০৭ টাকা এবং ১৮ ক্যারেট ৫ হাজার৭১৫ টাকা দরে বিক্রি হবে। চলতি বছরে রুপার দাম এখন পর্যন্ত ২০ বার সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ বারই দাম বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) ও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সাধারণ মধ্যবিত্তের জন্য স্বর্ণের গহনা এখন কেবল আভিজাত্য নয়, বরং ধরাছোঁয়ার বাইরের এক বিলাসবহুল বস্তুতে পরিণত হচ্ছে।