• ব্যবসায়
  • বাংলাদেশ ব্যাংকে মব কালচার: অতীতে কেবল ফখরুদ্দীন আহমদই নিয়েছিলেন কঠোর ব্যবস্থা

বাংলাদেশ ব্যাংকে মব কালচার: অতীতে কেবল ফখরুদ্দীন আহমদই নিয়েছিলেন কঠোর ব্যবস্থা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে ২০০৩ সালে ফখরুদ্দীন আহমদের নেওয়া সেই নজিরবিহীন সাহসী পদক্ষেপের স্মৃতিচারণ এবং বর্তমান মব কালচারের বিশ্লেষণ।

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
বাংলাদেশ ব্যাংকে মব কালচার: অতীতে কেবল ফখরুদ্দীন আহমদই নিয়েছিলেন কঠোর ব্যবস্থা

বাংলাদেশ ব্যাংকে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ‘মব’ বা বিশৃঙ্খলা নতুন কিছু নয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে এ ধরনের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে মাত্র একবারই অত্যন্ত কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে। ২০০৩ সালে তৎকালীন গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদ সরকার সমর্থিত ইউনিয়ন নেতাদের অরাজকতার বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নিয়ে ১০ জন প্রভাবশালী নেতা-কর্মীকে চাকরিচ্যুত করেছিলেন। সেই নজিরবিহীন ঘটনার পর আর কখনোই বিশৃঙ্খলাকারীদের রাজনৈতিক আশ্রয় ছাড়া এমন শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়নি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ২০০৩ সালের ঘটনা

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে ২০০৩ সালের ২৮ অক্টোবর একটি কালো দিন হিসেবে পরিচিত। সেদিন তৎকালীন গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তার নিজ দপ্তরে অবরুদ্ধ করে রাখে সরকার সমর্থিত নীল দলের (জাতীয়তাবাদী কর্মচারী সমিতি) নেতারা। তাদের দাবি ছিল অবাস্তব—এক রাতের মধ্যে ১০০ জন কর্মচারীকে সহকারী পরিচালক পদে পদোন্নতি দিতে হবে।

বিক্ষোভ চলাকালে প্রায় ৪০০-৫০০ জন কর্মচারী গভর্নরের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেয় এবং একপর্যায়ে জোরপূর্বক তার কক্ষে প্রবেশ করে তাকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করে। তৎকালীন সময়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকলেও ফখরুদ্দীন আহমদ দমে যাননি।

গভর্নরের কঠোর সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা

বিৃঙ্খলার মাত্র দুই দিন পর, ৩০ অক্টোবর ১০ জন প্রভাবশালী নেতাকে সরাসরি চাকরিচ্যুত করা হয়। এদের মধ্যে অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন এবং সিবিএ-র শীর্ষ স্থানীয় নেতারাও ছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, চাকরিচ্যুতরা সবাই সরকারি দলের লোক হওয়ায় সরকারের একটি অংশ তাদের প্রতি নমনীয় হওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদের পেশাদারিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া হয়। ফলে সেই চাকরিচ্যুতরা আর কখনোই কাজে ফিরতে পারেননি।

১৯৯৬ সালের হেনস্তা ও খোরশেদ আলম

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে হেনস্তা করার আরেকটি নজির স্থাপিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই তৎকালীন গভর্নর খোরশেদ আলমের নিয়োগ বাতিল করে তাকে কার্যত বরখাস্ত করা হয়। দৈনিক ইত্তেফাকের সেই সময়ের রিপোর্ট অনুযায়ী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খোরশেদ আলমকে ঘেরাও করে স্লোগান দিয়েছিল এবং নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিতে এলেও তাকে অফিস থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে নতুন গভর্নর লুৎফর রহমান সরকারের অনুরোধে তিনি নিরাপদ প্রস্থান করেন।

বিদায়কালে সালেহউদ্দিন আহমেদের অভিজ্ঞতা

২০০৯ সালে গভর্নর হিসেবে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের শেষ কার্যদিবসেও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে। অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা ইনক্রিমেন্টের দাবিতে তাকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত গভর্নর মূল ফটকের ভিড় এড়িয়ে পেছনের পকেট গেট দিয়ে ব্যাংক ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

বর্তমান পরিস্থিতি ও উপসংহার

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে মব তৈরি করে ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা এবং গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের তড়িঘড়ি ব্যাংক ত্যাগের ঘটনা আবারও পুরনো স্মৃতিকে উসকে দিচ্ছে। ইতিহাসের পর্যালোচনা বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ফখরুদ্দীন আহমদের সেই কঠোর পদক্ষেপই ছিল একমাত্র উদাহরণ যেখানে রাজনৈতিক চাপের মুখে আপস করা হয়নি।

Tags: bangladesh bank governor banking news fakhruddin ahmed mob culture central bank history administrative action