অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রচিত হতে যাচ্ছে এক মহাকাব্য। প্রথমবারের মতো উইমেন্স এশিয়ান কাপের (Women's Asian Cup) মূল মঞ্চে পা রাখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি চীন—যারা এই টুর্নামেন্টে রেকর্ড নয়বারের চ্যাম্পিয়ন এবং সাবেক বিশ্ব রানার্সআপ। সিডনির কমব্যাংক স্টেডিয়ামে (CommBank Stadium) বাংলাদেশের এই অভিষেক ম্যাচটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের জন্য বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের এক অগ্নিপরীক্ষা।
ডেভিড বনাম গোলিয়াথ: শক্তির ভারসাম্য ও বাস্তবতা র্যাঙ্কিং আর অভিজ্ঞতায় চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়া চীনের মেয়েরা ফুটবলের এক বৈশ্বিক শক্তি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ এই প্রথম এশিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নামছে। জাতীয় দলের প্রধান কোচ পিটার জেমস বাটলার বাস্তববাদী হয়েই এই লড়াইকে আখ্যা দিয়েছেন ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’-এর (David vs. Goliath) লড়াই হিসেবে। তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগে তিনি কৌশলগত রক্ষণভাগের চেয়ে ইতিবাচক ফুটবলেই বেশি জোর দিচ্ছেন। বাটলারের মতে, ফুটবল মাঝে মাঝে অবিশ্বাস্য গল্পের জন্ম দেয় এবং সেই ‘অবিশ্বাস্য’ কিছুর লক্ষ্যেই মাঠে নামবে তার শিষ্যরা।
বাছাই পর্বের সেই অভাবনীয় জয়ই প্রেরণা ২০২৫ সালের জুলাইয়ে মিয়ানমারকে ২-১ গোলে হারিয়ে এশিয়ান কাপের টিকিট নিশ্চিত করেছিল বাংলাদেশ। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে (FIFA Ranking) অনেক এগিয়ে থাকা মিয়ানমারের বিপক্ষে সেই জয়টিই এখন বাটলারের তুরুপের তাস। তিনি বলেন, “সেদিন কেউ ভাবেনি আমরা মিয়ানমারকে হারাব। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম আর প্রস্তুতির ফলে আমরা অসাধ্য সাধন করেছিলাম। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত আমাদের আত্মবিশ্বাস যোগাচ্ছে। মেয়েরা যোগ্য দল হিসেবেই এখানে এসেছে এবং আমরা ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি (Solid Foundation) তৈরি করতে চাই।”
বিগ ম্যাচে অধিনায়ক আফঈদার প্রত্যয় দলের অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার জানেন প্রতিপক্ষ কতটা শক্তিশালী। চীনের গতিময় ফুটবল এবং এরিয়াল ক্রস (Aerial Cross) সামলানো রক্ষণভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তবে রক্ষণাত্মক হয়ে কেবল গোল ঠেকানোর মানসিকতা নেই এই লড়াকু দলটির। আফঈদা দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে জানিয়েছেন, ফলাফল যাই হোক, লড়াইয়ে কোনো আপস করবে না বাংলাদেশ।
সিডনিতে তাবিথ আওয়ালের সমর্থন ও প্রবাসী দর্শকদের উন্মাদনা বাফুফে (BFF) সভাপতি তাবিথ আওয়াল এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে নিজেই সিডনিতে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি দলকে সাহস জুগিয়ে বলেন, “আমি এখানে একজন সভাপতি হিসেবে নয়, বরং একজন বড় সমর্থক হিসেবে এসেছি। আমাদের নারী বা পুরুষ কোনো দলই এর আগে এত উঁচু পর্যায়ে খেলার সুযোগ পায়নি। চীন বিশ্বকাপে খেলে, তারা সুসংগঠিত; কিন্তু আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমাদের মেয়েরা তাদের সেরাটা উপহার দেবে।” সিডনিতে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি সমর্থকও গ্যালারি মাতাতে প্রস্তুত রয়েছেন।
প্রস্তুতির ভিন্নতা: ‘ক্যাম্প গুলিস্তান টু ক্যাম্প অস্ট্রেলিয়া’ কোচ পিটার বাটলার বেশ স্পষ্টভাষী। প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে তিনি বলেন, “আমরা ক্যাম্প গুলিস্তান থেকে সরাসরি ক্যাম্প অস্ট্রেলিয়ায় এসেছি। হাই-ইনটেনসিটি (High-intensity) ফুটবলে টিকে থাকতে হলে প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। যদি আপনি দৌড়াতে না পারেন, তবে চীন আপনাকে শাস্তি দেবে।” তবে তার শিষ্যদের ‘বিশাল হৃদয়ের’ ওপর পূর্ণ আস্থা আছে তার। তিনি মনে করেন, শারীরিক গঠনে পিছিয়ে থাকলেও মানসিক দৃঢ়তায় বাংলাদেশের মেয়েরা অনন্য।
মঙ্গলবার এশিয়ার ফুটবলে এক নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় বাংলাদেশ। চীনের মতো দানবীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে হার না মানা মানসিকতা নিয়ে লড়াই করতে পারাই হবে সাবিনা-আফঈাদাদের জন্য বড় সার্থকতা। ফুটবল বিশ্ব তাকিয়ে আছে—বাটলারের হাত ধরে বাংলার বাঘিনীরা কোনো মিরাকল (Miracle) ঘটাতে পারে কি না, তা দেখতে।