শনিবারের সেই ভোরে যখন আকাশছোঁয়া বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল তেহরান, বিশ্ববাসী একে একটি আকস্মিক আক্রমণ হিসেবে দেখলেও এর নেপথ্যে ছিল কয়েক দশকের নিপুণ পরিকল্পনা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার এই যৌথ ‘অপারেশন’ (Operation) ছিল মূলত আধুনিক প্রযুক্তির পরাকাষ্ঠা এবং এক অবিশ্বাস্য গোয়েন্দা জাল। সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে তেহরানের খোদ ট্রাফিক ক্যামেরা এবং সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে খামেনির গতিবিধি ট্র্যাক করেছিল ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাফিক ক্যামেরার অন্তরালে মোসাদের চোখ ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের রাজপথে বসানো ট্রাফিক ক্যামেরাগুলো দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে হ্যাক করে রেখেছিল ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ (Mossad)। গোয়েন্দা অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, একটি নির্দিষ্ট কোণের ক্যামেরা থেকে পাওয়া ফুটেজ ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। সেই ক্যামেরার মাধ্যমেই শনাক্ত করা হয়েছিল খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত যানবাহন।
গোয়েন্দারা কেবল গাড়িই নয়, বরং খামেনির বিশ্বস্ত ও উচ্চপ্রশিক্ষিত দেহরক্ষীদের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করতেন। তাঁরা কোথায় গাড়ি পার্ক করতে পছন্দ করেন, কোন সময় সুরক্ষিত প্রাঙ্গণ থেকে বের হন—এই তথ্যের মাধ্যমেই খামেনির একটি নিখুঁত ‘ডেইলি রুটিন’ (Daily Routine) তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল।
অ্যালগরিদম ও ডেটা পয়েন্টের লড়াই এই অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছিল অত্যন্ত উন্নত ‘অ্যালগরিদম’ (Advanced Algorithm)। এর মাধ্যমে খামেনির নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মীদের সম্পর্কে একটি বিশাল ডেটাবেস তৈরি করে সিআইএ (CIA) ও মোসাদ। সেখানে কর্মীদের বাড়ির ঠিকানা, যাতায়াতের রুট এবং কার ওপর কোন নেতার সুরক্ষার দায়িত্ব রয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ ছিল।
তদন্তকারী এক সূত্র জানায়, ইজরায়েল ‘সোশ্যাল নেটওয়ার্ক অ্যানালাইসিস’ (Social Network Analysis) নামক একটি গাণিতিক কৌশল প্রয়োগ করে কোটি কোটি ‘ডেটা পয়েন্ট’ (Data Point) পরীক্ষা করেছিল। এর মাধ্যমেই শনিবার সকালে খামেনি ঠিক কখন তাঁর অফিসে পৌঁছাবেন এবং তাঁর পাশে কারা থাকবেন, তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়।
ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও মোবাইল টাওয়ারে হস্তক্ষেপ হামলার ঠিক আগে খামেনির নিরাপত্তা বেষ্টনীকে অন্ধ করে দিতে এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করে ইজরায়েল। তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিটের (Pasteur Street) কাছে অবস্থিত প্রায় এক ডজন মোবাইল ফোন টাওয়ারের যন্ত্রাংশে আগেই হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল। এর ফলে খামেনির নিরাপত্তা টিমের সদস্যরা যখন কোনো জরুরি সতর্কতা পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁদের ফোন লাইনগুলো কৃত্রিমভাবে ‘বিজি’ (Busy) দেখানো হচ্ছিল। ফলে কোনো সতর্কতা সংকেত আসার আগেই বিমান হামলাটি সম্পন্ন হয়।
‘তেহরানকে আমরা জেরুজালেমের মতোই চিনি’ একজন বর্তমান ইজরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা দম্ভোক্তি করে বলেন, “এই হামলার অনেক আগে থেকেই আমরা তেহরানকে জেরুজালেমের মতোই চিনতাম। যখন আপনি কোনো জায়গার অলিগলি নিজের শৈশবের খেলার মাঠের মতো চিনবেন, তখন সেখানকার প্রতিটি জিনিসের ওপরই আপনার নিয়ন্ত্রণ থাকে।”
ইজরায়েলি সামরিক রিজার্ভের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইতাই শাপিরা, যিনি গোয়েন্দা অধিদপ্তরে ২৫ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি জানান—ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্কৃতিতে ‘টার্গেটিং ইন্টেলিজেন্স’ (Targeting Intelligence) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, “যদি নীতিনির্ধারকরা কাউকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন, তবে আমাদের সংস্কৃতি হলো সেই লক্ষ্যবস্তুর নিখুঁত তথ্য সরবরাহ করা।”
সাফল্য ও আগামীর বিতর্ক কয়েক দশক ধরে ইজরায়েল বিদেশে শত শত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে—তা সে পরমাণু বিজ্ঞানী হোক কিংবা রাজনৈতিক নেতা। তবে খামেনির মতো একজন ৮৬ বছর বয়সী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বকে হত্যার পর এই প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত বিজয় (Strategic Success) আনবে কি না, তা নিয়ে খোদ ইজরায়েলের ভেতরেই চলছে তীব্র বিতর্ক।