ইরানের আকাশসীমায় এখন শুধুই যুদ্ধের ডামাডোল। তেহরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা কেবল দুই দেশের সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরতির জোরালো দাবি উঠলেও, পর্দার আড়ালে ওয়াশিংটন প্রস্তুতি নিচ্ছে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকো’ (Politico)-র এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—আগামী সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করছে বাইডেন-ট্রাম্পের উত্তরসূরি প্রশাসন।
পেন্টাগনের ‘অপারেশনাল’ তৎপরতা ও গোয়েন্দা সম্প্রসারণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগন (Pentagon) ইতোমধ্যেই এই সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ ও জনবল জোগাড় করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে গোয়েন্দা কার্যক্রম বা ‘ইন্টেলিজেন্স’ (Intelligence) সেক্টরে অভাবনীয় গতি আনা হয়েছে।
ফ্লোরিডার টাম্পায় অবস্থিত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)-এর সদর দফতরে অতিরিক্ত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মোতায়েনের জন্য জরুরি অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। পলিটিকোর দাবি, এই অতিরিক্ত কর্মকর্তারা অন্তত ১০০ দিন কিংবা আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে চলমান বিশেষ সামরিক অভিযানে নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা দেবেন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পেন্টাগনের এই তড়িঘড়ি পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন কেবল আকাশপথে হামলা নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী ‘স্ট্র্যাটেজিক’ যুদ্ধের পথে হাঁটছে।
সময়সীমা নিয়ে ধোঁয়াশা: ট্রাম্প বনাম বাস্তব পরিস্থিতি যুদ্ধের স্থায়িত্ব নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ মহলে দেখা দিয়েছে মতভেদ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযান হয়তো চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। তবে পরিবর্তিত রণক্ষেত্রে পরিস্থিতির জটিলতা বাড়ায় তিনি এখন দীর্ঘ লড়াইয়ের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ (Pete Hegseth) জানিয়েছিলেন, এই সংঘাত সর্বোচ্চ আট সপ্তাহ বা দুই মাস পর্যন্ত গড়াতে পারে। কিন্তু ‘পলিটিকো’-র ফাঁস করা গোয়েন্দা নথিপত্র বলছে ভিন্ন কথা। সেপ্টেম্বরের এই ডেডলাইন বা সময়সীমা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ইরানকে চূড়ান্তভাবে দুর্বল না করা পর্যন্ত পিছু হটতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
আমেরিকার ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজন ও ‘মার্কো রুবিও’ ফ্যাক্টর ইরানের ওপর এই সরাসরি আক্রমণ নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই বইছে বিতর্কের ঝড়। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় শিবিরের অনেক সদস্যই মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ (Endless War) জড়ানোর বিপক্ষে। এমনকি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের একটি বড় অংশও এখন এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (Marco Rubio) অত্যন্ত সাফ ভাষায় স্বীকার করেছেন যে, ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্র এই সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। তার মতে, ইরানের পারমাণবিক হুমকি রুখতে ‘ডাইরেক্ট কনফ্রন্টেশন’ বা সরাসরি সংঘাত এখন সময়ের দাবি।
তেহরানের পাল্টা হুঙ্কার: লক্ষ্য অর্জনে অনড় ইরান এদিকে শত্রু শিবিরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে মোটেও বিচলিত নয় ইরান। ইরানের প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ (Tasnim)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির সামরিক নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা লড়াই চালিয়ে যাবে।
খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দফতরের ডেপুটি কমান্ডার জেনারেল কিওমারস হায়দারি হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ‘এই যুদ্ধ কতদিন চলবে, সেটি আমাদের কাছে মুখ্য নয়। ইরান তার লক্ষ্য অর্জন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে চূড়ান্ত ও কঠোর আঘাত না দেওয়া পর্যন্ত মাঠ ছাড়বে না।’
এখন দেখার বিষয়, মধ্যপ্রাচ্যের এই রণক্ষেত্র কি কেবল সেপ্টেম্বরেই শান্ত হবে, নাকি তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথে বিশ্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিশ্ব রাজনীতি এখন কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে আছে।