দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মতো স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘দলীয়করণ’ করছে। তার মতে, একটি কার্যকর ও টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের (Democratic State) ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।
কূটনৈতিক মহলে উদ্বেগ ও এনসিপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে এনসিপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিদেশি কূটনীতিকদের সম্মানে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন শক্তিধর রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এই ‘Diplomatic Outreach’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সুশাসনের (Governance) চ্যালেঞ্জগুলো আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম।
প্রতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা ও দলীয়করণের প্রভাব বক্তব্যের শুরুতেই নাহিদ ইসলাম দেশের আর্থিক খাত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রধান স্তম্ভগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুদকের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে সুকৌশলে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। যখন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবে পরিচালিত হয়, তখন জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা (Transparency) চরম হুমকির মুখে পড়ে। এটি কোনোভাবেই একটি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য এক অশনিসংকেত।”
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কারের দাবি নাহিদ ইসলাম তার বক্তৃতায় ‘জুলাই সনদ’-এর গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, গণআকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া সেই জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সংস্কার প্রক্রিয়ায় (Reform Process) যে গতি থাকার কথা ছিল, তা বর্তমানে দৃশ্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
এই অচলাবস্থা কাটাতে তিনি অনতিবিলম্বে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ (Constitution Reform Council) গঠন করার জোর দাবি জানান। তিনি বলেন, “জুলাই সনদে আমরা স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করেছিলাম যে রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজানো হবে। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অবিলম্বে সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারিত্বের (Professionalism) সাথে জনকল্যাণে নিয়োজিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।”
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান উপস্থিত বিদেশি কূটনীতিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিরোধী দলীয় এই নেতা বলেন, বাংলাদেশে আইনের শাসন (Rule of Law) এবং জবাবদিহিতা (Accountability) নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মহলের গঠনমূলক ভূমিকা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ একটি ভারসাম্যহীন রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।
ইফতার মাহফিলে এনসিপির অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজনে কূটনীতিকদের সরব উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।