মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে। গত কয়েক দিনে দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে কুয়েতে অবস্থিত নিজেদের দূতাবাস থেকে জরুরি ভিত্তিতে কর্মকর্তা ও কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (State Department)। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকেই শুরু হয়েছে কূটনীতিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের স্বদেশে ফেরার প্রক্রিয়া। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটি ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে অন্যতম বড় কোনো ‘সিকিউরিটি প্রটোকল’ (Security Protocol) বা নিরাপত্তা পদক্ষেপ।
কৌশলগত মিত্র কুয়েত ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ কুয়েত দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যালাই’ (Strategic Ally) বা গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে ইরানের সাথে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই এই ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে নিয়মিত ড্রোন (Drone) ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে তেহরান। মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, ইরানের মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অচল করে দেওয়া।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও দূতাবাসের নিরাপত্তা সংকট ওয়াশিংটন থেকে দূতাবাস খালি করার এই চূড়ান্ত নির্দেশ মূলত আসে গত বুধবারের (৪ ফেব্রুয়ারি) একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর। সেদিন কুয়েতের আকাশসীমায় ইরান থেকে নিক্ষিপ্ত একটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়। কুয়েতি সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তাদের ‘এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’ (Air Defense System) অত্যন্ত সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে মাঝ-আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ধ্বংস করা ক্ষেপণাস্ত্রটির অবশিষ্টাংশ বা ‘ডিব্রিস’ লোকালয়ে পতিত হওয়ায় বেশ কয়েকটি যানবাহন ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এই ঘটনার পরপরই পেন্টাগন ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট পরিস্থিতির পুনর্মূল্যায়ন করে এবং কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। ফলস্বরূপ, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই দূতাবাস খালি করার আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করা হয়।
অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য ও যুদ্ধের প্রভাব সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কুয়েত থেকে দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার অর্থ হলো ওই অঞ্চলে যুদ্ধের ভয়াবহতা আরও দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হতে পারে। ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষের এই সরাসরি সংঘাত এখন কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিবিসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুয়েত ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি রাখা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কুয়েত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ না জানানো হলেও, তাদের আকাশসীমায় বিদেশি ক্ষেপণাস্ত্রের অনুপ্রবেশ দেশটির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটনের এই পশ্চাদপসরণ কি কেবল সাময়িক নিরাপত্তা কৌশল, নাকি বড় কোনো সামরিক অভিযানের পূর্বপ্রস্তুতি।