• জাতীয়
  • জ্বালানি তেল সংকটের আতঙ্ক: সীমিত বিক্রিতে বাড়ছে ভোগান্তি

জ্বালানি তেল সংকটের আতঙ্ক: সীমিত বিক্রিতে বাড়ছে ভোগান্তি

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
জ্বালানি তেল সংকটের আতঙ্ক: সীমিত বিক্রিতে বাড়ছে ভোগান্তি

আন্তর্জাতিক অস্থিরতা এবং ইরান–আমেরিকা-ইসরায়েলের উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে; এমন আশঙ্কায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তেল সংকটের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে অনেক পেট্রোল পাম্পে দেখা গেছে দীর্ঘ লাইন।

কোথাও এক থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সারি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। আগামীকাল রোববার থেকে নতুন নিয়মে তেল বিক্রির জন্য সরকার নির্দেশনা দিলেও গত বৃহস্পতিবার রাত থেকেই পাম্প মালিকরা অল্প পরিমাণে জ্বালানি বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

শনিবার (৭ মার্চ) রাজধানীর বেশ কয়েকটি পাম্পে সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক পাম্পে তেল বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং চালক ও পেশাদার গাড়িচালকরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।

লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, মিলছে অল্প তেল রাজধানীর রামপুরা এলাকার একটি পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রাইড শেয়ারিং চালক ইসমাইল হোসেন বলেন, সকাল থেকে দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে মাত্র দুই লিটার তেল পেয়েছি।

তাও দুইবার লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। প্রথমবার এক লিটার, দ্বিতীয়বার আরেক লিটার। এরপর খিলগাঁও থেকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত একটি রাইড নিয়েছি। সকাল থেকে বাসা থেকে বের হয়ে তিন ঘণ্টা সময় গেলেও আয় হয়েছে মাত্র ১৫০ টাকা।

আরেক রাইড শেয়ারিং চালক সুমন বলেন, তেলের লাইন এত বড় যে একবার তেল নিতেই ঘণ্টার বেশি সময় চলে যায়। পাম্পেই যদি সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাহলে কাজ করব কখন? এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।

কিছু ফিলিং স্টেশন মালিক জানান, তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা এবং সরবরাহ পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় তারা আগাম সতর্কতা হিসেবে বিক্রি সীমিত করেছেন।

রামপুরা হাজীপাড়ার একটি পাম্পের অপারেটর রুমেল মিয়া বলেন, ক্রেতারা হঠাৎ করে বেশি তেল নিতে চাইছেন। তাই আমরা সীমিত পরিমাণে দিচ্ছি।

তবে বিক্রি বন্ধ করিনি। অনেক জায়গায় সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় পাম্পগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা তবুও খোলা রেখেছি।

সবচেয়ে বিপাকে দূরপাল্লার চালকরা এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকচালকরা। সবজি পরিবহনকারী ট্রাকচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, তেল পাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে থাকতে হচ্ছে। আবার সীমিত করে তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে বারবার পাম্পে যেতে হচ্ছে, সময়ও নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চললে আমি যে কাঁচামাল পরিবহন করি, তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রাইভেটকার চালক লিয়াকত হোসেন বলেন, নিয়মিত যাতায়াতের জন্য তেল দরকার। কিন্তু এখন তেলের জন্য আলাদা সময় বের করতে হচ্ছে। এটা খুবই কষ্টকর।

নতুন নিয়মে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার আগামীকাল রোববার থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল বিক্রির নিয়ম চালু করেছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোটরসাইকেল সর্বোচ্চ ২ লিটার, প্রাইভেটকার ১০ লিটার, জিপ বা মাইক্রোবাস ২০–২৫ লিটার, পিকআপ ও লোকাল বাস (ডিজেলচালিত) ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার ট্রাক বা বাস সর্বোচ্চ ২০০ লিটার পর্যন্ত তেল নিতে পারবে দৈনিক।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তেল নেওয়ার সময় ভোক্তাকে তেলের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে ক্রয় রশিদ দিতে হবে। পরবর্তীবার তেল নেওয়ার সময় আগের ক্রয় রশিদের মূল কপি জমা দিতে হবে।

কিন্তু বিক্রেতারা বৃহস্পতিবার রাত থেকেই অল্প পরিমাণে জ্বালানি বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ করেছে ভোক্তারা। তারা বলছেন, জ্বালানি বিক্রেতারা ‘উছিলা’র অপেক্ষা করেন। সরকার রোববারের কথা বলেছে। কিন্তু বিক্রেতারা সময়ের আগেই সেটি শুরু করেছেন। এমন একটা দেশে আমরা বসবাস করি, যে নিয়ম সময় অনুযায়ী করা উচিৎ, সেটা সময়ের আগে থেকে শুরু হয়ে যায়। কিন্তু যেটা আদৌ করা দরকার, সেটি নিয়ে কোনো বিকার নাই।

নাফি নামে এক বেসকারি চাকরিজীবী বলেন, সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করা এ দেশের সব ব্যবসায়ীদের ধর্ম। তারা নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতাকে অনেক বেশি প্রাধান্য দেয়। সরকার রোববার থেকে তেল বিক্রির নতুন নিময় নির্ধারণ করলেও বিক্রেতারা আগে থেকে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে ফেলেছে। এটার পেছনে কাজ করে সিন্ডিকেট। যতদিন ধরে এসব বে-আইনি সিন্ডিকেট বন্ধ না হবে, ততদিন এই দেশে চেইন অব কমান্ড সৃষ্টি হবে না।

তবে বিক্রেতারা বলছেন, ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েলে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় দেশে জ্বালানি সরবরাহ কমে গেছে। তারা নিরুপায় হয়ে কম পরিমাণে তেল বিক্রি করছে। জনগণের ভোগান্তি হচ্ছে ঠিকই। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে আবার সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে বলে আশা তাদের।

দেশে তেলের বর্তমান মজুত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে ডিজেল সংরক্ষণ সক্ষমতা রয়েছে ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। বর্তমানে মজুত রয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৪০ টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৯ শতাংশ। দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪ হাজার ৪৭৮ টন ডিজেল বিক্রি হচ্ছে। বর্তমান মজুত অনুযায়ী প্রায় সাত দিন ডিজেল সরবরাহ সম্ভব।

অন্যদিকে অকটেন সংরক্ষণ সক্ষমতা রয়েছে ৫৩ হাজার ৬১৬ টন। বর্তমানে অকটেন মজুত রয়েছে ২৮ হাজার ৪৮৮ টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ৫৩ শতাংশ। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার টন অকটেন বিক্রি হচ্ছে। এই মজুতে প্রায় ১৪ দিন অকটেন সরবরাহ করা সম্ভব।

পাশাপাশি পেট্রোল সংরক্ষণ সক্ষমতা রয়েছে ৩৭ হাজার ১৩ টন। বর্তমানে মজুত রয়েছে ১৮ হাজার ২৬৩ টন পেট্রোল, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ৪৯ শতাংশ। দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার ৩৪৫ টন পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে। এই মজুত দিয়ে প্রায় আট দিন পেট্রোল সরবরাহ করা সম্ভব।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, দেশের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতির কারণে কখনো কখনো আমদানি ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব বা বাধা তৈরি হয়।

তবে সরকারের দাবি, দেশে নিয়মিতভাবে জ্বালানি তেলের পার্সেল আসছে এবং প্রধান স্থাপনা থেকে সারাদেশের ডিপোগুলোয় রেলওয়ে ওয়াগন ও ট্যাংকারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যেই পর্যাপ্ত বাফার স্টক গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আতঙ্ক নয়, সহযোগিতা চায় কর্তৃপক্ষ সরকার আরও জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক খবর ছড়িয়ে পড়ায় ভোক্তাদের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রয়োজনের বেশি তেল কিনে মজুত করার চেষ্টা করছেন, যা সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতি মাসের শুরুতে সরকার জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে দেয়, যা বর্তমানে অপরিবর্তিত রয়েছে। সংকটের অজুহাতে সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে তেল বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশা, ভোক্তা ও ডিলাররা নির্দেশনা মেনে চললে খুব শিগগিরই দেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

Tags: আতঙ্ক জ্বালানি তেল সংকট সীমিত ভোগান্তি