• আন্তর্জাতিক
  • ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের বড় ঝুঁকি: খরচের বোঝা

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের বড় ঝুঁকি: খরচের বোঝা

সিএনএনের বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের বড় ঝুঁকি: খরচের বোঝা

বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অর্থনৈতিকভাবে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। মর্টগেজ সুদের হার কমছিল, মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং তেল-গ্যাসের দামও ছিল সস্তা। কিন্তু ইরানের সঙ্গে তার যুদ্ধ সেই পরিস্থিতিকে নষ্ট করে দিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তা আমেরিকানদের ওপর গভীর ও সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ইতোমধ্যেই চাপে থাকা লাখো মানুষের জন্য এটি বড় উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে এ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য এটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। এই যুদ্ধ কতদিন চলবে তা কেউই জানে না। যদি যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সংঘাতের ইতি টানে, তাহলে গত সপ্তাহে তেল ও গ্যাসের যে দাম হঠাৎ বেড়েছে, তা দ্রুতই কমে যেতে পারে এবং এই সময়টিকে সাময়িক একটি ধাক্কা হিসেবেই দেখা হতে পারে।

তবে শুক্রবার ট্রাম্প বলেছেন, ইরান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষ করবে না। এদিকে ইরান যদি জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতে থাকে, তাহলে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোও সহজে এই অঞ্চলে আবার সরবরাহ শুরু করতে চাইবে না।

এমন এক সময় জ্বালানির দাম বাড়ছে যখন অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। শুক্রবার প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ কর্মসংস্থানের প্রতিবেদনের পর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, শ্রমবাজারে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেখা দিলে তা ব্যাপক চাকরি হারানোর পরিস্থিতিতে রূপ নিতে পারে।

যদি মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এক ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। একদিকে দাম বাড়বে, অন্যদিকে বেকারত্বও বাড়বে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা ফেডারেল রিজার্ভের জন্যও কঠিন হবে।

ফলে ভোটারদের মনে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি ইতোমধ্যে গুরুত্ব পেয়েছে, অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সংকট আরও গভীর হতে পারে।

গ্যাসের দাম উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ে আমেরিকানরা দীর্ঘদিন ধরেই বিরক্ত।

তবে স্বস্তির বিষয় ছিল গ্যাসোলিনের দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকা। ট্রাম্প বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে বলেন, গ্যাসের দাম বাড়া নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন। গত এক সপ্তাহে প্রতি গ্যালনে গ্যাসের দাম ৩৪ সেন্ট বেড়ে তার দুই মেয়াদের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ট্রাম্প বলেন, ‘যদি (গ্যাসের দাম) বাড়ে, তাহলে বাড়ুক’।

তবে গ্যাসের দাম এমন একটি খরচ, যা সাধারণ মানুষ খুব সহজেই টের পায়। শহরের সর্বত্র পেট্রোল পাম্পে বড় অঙ্কে দাম লেখা থাকে এবং অধিকাংশ চালক গড়ে সপ্তাহে একবার গাড়িতে জ্বালানি ভরেন। তাই গ্যাসের দাম বাড়লে মানুষের ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে তাদের ধারণায় বড় প্রভাব পড়তে পারে।

গত এক বছরে কম গ্যাসের দামই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করেছে। কিন্তু গ্যাসের দাম যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে।

মুডিজ অ্যানালিটিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জ্যান্ডি বলেন, “গ্যাসের দাম যদি গ্যালনপ্রতি ৩ ডলার থেকে ৩.২৫ ডলারে ওঠে, সেটি এক ধরনের বিষয়। কিন্তু যদি ৩ ডলার থেকে ৪ ডলারে উঠে যায়, তাহলে মানুষের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “জীবনযাত্রার ব্যয় সংক্রান্ত যেকোনো বিষয় নিয়ে আমেরিকানরা এখন খুবই সতর্ক।”

মূল্যস্ফীতি জানুয়ারিতে ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের তুলনায় মাত্র ২.৪ শতাংশ বেড়েছে, যা আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছিলেন, শুল্কজনিত মূল্যবৃদ্ধি এ বছর শেষ হয়ে গেলে ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতি আরও কমে আসবে। কিন্তু জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়লে সেই হিসাব পাল্টে যেতে পারে।

জেট ফুয়েলের দাম বাড়লে বিমান টিকিটের দামও বাড়তে পারে। পরিবহন খরচ বাড়লে মুদিপণ্যের দামও বাড়বে। আর যদি দীর্ঘ সময় ধরে দাম বেশি থাকে, তাহলে প্লাস্টিকের মতো পেট্রোলিয়ামভিত্তিক পণ্যের দামও বাড়তে পারে, যার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়বে।

এই কারণেই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং তেলের দাম বাড়তে থাকলে এ বছর মূল্যস্ফীতি আবার ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে গ্রাহকদের জানিয়েছেন গোল্ডম্যান স্যাকস-এর অর্থনীতিবিদরা।

এর আগে তারা ধারণা করেছিলেন, বছরের শেষে মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে নেমে আসবে।

দাম বাড়লে ভোক্তাদের ব্যয় কমে যেতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগেই চতুর্থ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কমে গিয়েছিল এবং জানুয়ারিতে খুচরা বিক্রি ২০২৫ সালের মে মাসের পর সবচেয়ে বেশি হারে কমেছে।

মার্ক জ্যান্ডি বলেন, “দাম যত বাড়বে, মূল্যস্ফীতির প্রভাব তত বাড়বে। আর প্রকৃত অর্থনীতির অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির ক্ষতিও তত বাড়বে। এখানে কোনো ইতিবাচক দিক নেই, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য এটি পুরোপুরি নেতিবাচক।”

আবাসন খাত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাড়ি কিনতে আগ্রহীরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন। মর্টগেজ সুদের হার ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো ৬ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

গত নয় মাস ধরে সুদের হার ধীরে ধীরে কমছিল, যার পেছনে ফেডারেল রিজার্ভ গত বছর তিনবার সুদের হার কমানোর বড় ভূমিকা ছিল।

কিন্তু এখন যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে বেশি সুদ দাবি করছেন। ফলে ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ফলন বেড়েছে আর এর সঙ্গে যুক্ত মর্টগেজ সুদের হারও আবার ৬ শতাংশের উপরে উঠে গেছে।

নিজস্ব বাড়ি কেনার স্বপ্ন, যাকে প্রায়ই ‘আমেরিকান ড্রিম’ বলা হয়—মানুষের খরচের সামর্থ্য সম্পর্কে ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্র যেন এই ক্ষেত্রে একটি অগ্রগতির কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ আবাসন বাজারকে আবার স্থবির করে দিতে পারে।

যুদ্ধ কতদিন চলবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই যুদ্ধ কতদিন চলবে, যার উত্তর অজানা।

সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। তেল উৎপাদকদের অনেকের কাছেই মজুত রাখার জায়গা শেষ হয়ে যাচ্ছে, ফলে উৎপাদন কমছে এবং দাম আরও বাড়ছে।

মার্ক জ্যান্ডির মতে, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম টানা ১০ ডলার বাড়লে গড় মার্কিন পরিবারের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৪৫০ ডলার খরচ বাড়তে পারে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো ‘টানা’ বৃদ্ধি।

ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, খুব শিগগিরই হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে এবং তখন তেল-গ্যাসের দাম আবার কমবে।

তবে বাজার এখনো সন্দিহান। রোববার যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর প্রথম।

ইওয়াই-পার্থেননের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকো বলেন, “হয়তো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেলের দাম আবার কমে যাবে এবং এই সময়টাকে আমরা শুধু খারাপ একটি স্মৃতি হিসেবে মনে রাখব। আবার এমনও হতে পারে, কয়েক মাস পরও আমরা একই অবস্থায় থাকব, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে, সুদের হার বেশি এবং মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।”

তিনি যোগ করেন, “যদি সেটি হয়, তাহলে তখন আমরা চাকরি কমানো এবং সম্ভাব্য মন্দা নিয়ে কথা বলব।”

Tags: যুদ্ধে