দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ক্রেডিট কার্ডের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং গ্রাহকদের পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্রেডিট কার্ডের ঋণসীমা বড় আকারে বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে আগের চেয়ে অনেক বেশি অঙ্কের ঋণ দিতে পারবে। রোববার (১৫ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট (BRPD-১) এ সংক্রান্ত একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী নীতিমালা জারি করেছে।
ঋণসীমা এক লাফে ৪০ লাখ টাকা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিতরণযোগ্য ঋণের সর্বোচ্চ সীমা এখন ৪০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে একজন গ্রাহক ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পেতেন। অর্থাৎ, বড় কেনাকাটা বা জরুরি প্রয়োজনে গ্রাহকরা এখন আগের চেয়ে ১৫ লাখ টাকা বেশি ঋণ নিতে পারবেন। এই পদক্ষেপের ফলে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের কার্ড ব্যবহারের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অনিরাপদ ঋণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন
নতুন নীতিমালায় শুধুমাত্র সর্বোচ্চ ঋণসীমা বাড়ানো হয়নি, বরং 'Unsecured Loan' বা অনিরাপদ ঋণের ক্ষেত্রেও গ্রাহকদের জন্য বড় সুখবর দেওয়া হয়েছে। আগে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অনিরাপদ ঋণের সীমা ছিল ১০ লাখ টাকা, যা এখন বাড়িয়ে ২০ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো জামানত ছাড়াই গ্রাহকরা এখন আগের চেয়ে দ্বিগুণ ঋণ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। মূলত পেশাজীবী এবং নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মীদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে আরও উৎসাহিত করতেই এই সীমানা বাড়ানো হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহ ও নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে নগদ অর্থ (Cash) বহনের পরিবর্তে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই দ্রুত বাড়ছে। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং 'Digital Transaction'-এর প্রসারে ক্রেডিট কার্ড এখন একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে ক্রেডিট কার্ড ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আনতে আগের গাইডলাইন বা নীতিমালাটি সংশোধন ও হালনাগাদ করা হয়েছে।
গ্রাহক সুরক্ষা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা
শুধুমাত্র ঋণের অঙ্ক বাড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক; নতুন নীতিমালায় গ্রাহকের নিরাপত্তা এবং ব্যাংকগুলোর ‘Risk Management’ বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে:
১. দায়িত্বশীল ঋণ প্রদান: ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের ঋণের সক্ষমতা যাচাই করে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কার্ড ইস্যু করতে হবে। ২. বিরোধ নিষ্পত্তি: ক্রেডিট কার্ডের বিলিং সংক্রান্ত জটিলতা, জালিয়াতি (Fraud) বা কোনো ট্রানজ্যাকশন নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। ৩. গোপনীয়তা রক্ষা: গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্যের শতভাগ গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। ৪. বিলিং ও চার্জ: কার্ডের সুদের হার (Interest Rate), বার্ষিক চার্জ এবং বিলিং পদ্ধতি অত্যন্ত স্বচ্ছ হতে হবে যাতে গ্রাহক কোনোভাবেই প্রতারিত না হন।
জালিয়াতি রোধে নতুন গাইডলাইন
বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের পর্যালোচনায় দেখেছে যে, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের জালিয়াতি এবং বিলিং সংক্রান্ত অভিযোগও বাড়ছে। নতুন এই গাইডলাইনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এমন একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হয়েছে, যা একইসঙ্গে উদ্ভাবনী এবং নিরাপদ। এখন থেকে প্রতিটি ব্যাংককে এই হালনাগাদকৃত নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করে তাদের ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে অর্থের গতিশীলতা বাড়বে এবং ব্যাংকগুলোর কনজিউমার ক্রেডিট (Consumer Credit) খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।