মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রত্যক্ষ প্রভাবে চরম জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ (Strait of Hormuz) দিয়ে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কাতার ও ওমানের সঙ্গে থাকা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এলএনজি (LNG) সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এই জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন খোলা বাজার বা ‘স্পট মার্কেট’ (Spot Market) থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে গ্যাস কেনার পথে হাঁটছে সরকার, যা শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সংকটে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও বিকল্পের সন্ধান বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পূরণ হয় আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির মাধ্যমে। সাধারণত কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সাশ্রয়ী মূল্যে এই গ্যাস পাওয়া গেলেও যুদ্ধাবস্থার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা সচল রাখতে বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ৩ কার্গো এলএনজি আমদানির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
রেকর্ড মূল্য: ২৬৫৪ কোটি টাকার নতুন দায় সরকারি তথ্যমতে, স্পট মার্কেট থেকে এই ৩ কার্গো গ্যাস আমদানিতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক কোটেশন (International Quotation) প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যুক্তরাজ্যের ‘মেসার্স টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড’ থেকে এক কার্গো এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ‘পোসকো ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেশন’ থেকে দুই কার্গো এলএনজি কেনা হচ্ছে।
হিসাব অনুযায়ী, প্রতি এমএমবিটিইউ (MMBtu) গ্যাসের দাম পড়ছে ২০.৭৬ থেকে ২১.৫৮ মার্কিন ডলার। স্বাভাবিক সময়ে এই দর অনেক কম থাকলেও বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে দ্বিগুণ দাম দিয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। আগামী ৫ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিলের মধ্যে এই তিন কার্গো এলএনজি দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
শিল্প খাতের হাহাকার ও উৎপাদন ধসের শঙ্কা জ্বালানির এই চড়া মূল্য এবং সরবরাহ ঘাটতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে আছেন দেশের শিল্প মালিকরা। গত ছয় মাস ধরেই শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ (Gas Pressure) আশঙ্কাজনকভাবে কম। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য ‘শিপমেন্ট’ (Shipment) করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, ওয়ান ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সরাসরি উৎপাদন খরচ (Production Cost) বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে। শিল্পের চাকা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এখন সময়ের দাবি।
আমদানিনির্ভরতা বনাম দেশীয় সক্ষমতা বর্তমান পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার (Energy Security) জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক মনে করেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। তাঁর মতে, “বিদ্যমান দেশীয় গ্যাসকূপগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে দ্রুত খনন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনের জন্য ‘অফশোর এক্সপ্লোরেশন’ (Offshore Exploration) কার্যক্রমে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।”
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকার যদি এখনই ভর্তুকি সমন্বয় এবং দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের দিকে নজর না দেয়, তবে বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত করতে পারে।