সমন্বয়হীনতার চরম মাশুল দিল ১২টি জীবন কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার নেপথ্যে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার ভয়াবহ ত্রুটি চিহ্নিত করেছে কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেনটির সঙ্গে দায়িত্বরত গেটম্যানের কোনো ধরনের যোগাযোগ বা সিগন্যাল আদান-প্রদান ছিল না। এই ‘Communication Gap’ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাই মুহূর্তের মধ্যে ১২টি তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে আরও অনেককে।
লালমাই থেকে পদুয়ার বাজার: কী ঘটেছিল সেই রাতে? রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টা একজন গেটম্যান নিয়োজিত থাকেন। রেলওয়ের অপারেশনাল প্রোটোকল (Operational Protocol) অনুযায়ী, ট্রেনটি যখন আগের স্টেশন ‘লালমাই’ অতিক্রম করে, তখনই পদুয়ার বাজারের গেটম্যানের কাছে সিগন্যাল বা বার্তা পৌঁছানোর কথা। কিন্তু শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে সেই চেইন অফ কমান্ড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। গেটম্যানের কাছে ট্রেনের অবস্থান সংক্রান্ত কোনো আগাম তথ্য না থাকায় রেলক্রসিংটি উন্মুক্ত ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ‘মামুন পরিবহন’ নামক যাত্রীবাহী বাসটি লাইনে উঠে পড়ে এবং দ্রুতগামী ট্রেনের মুখে পড়ে যায়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও ‘অপারেশনাল ফেইলিওর’ রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগের ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ট্রেনের সঙ্গে গেটম্যানের যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের বিচ্যুতি ঘটেছে। তিনি বলেন, “ট্রেনটি লালমাই স্টেশন ক্রস করার সময়ই গেটম্যানের সতর্ক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে একটি মারাত্মক গ্যাপ তৈরি হয়। যখন গেটম্যান ট্রেনটির সান্নিধ্য বুঝতে পারেন, ততক্ষণে বাসটি লাইনের মাঝখানে চলে আসে। এই কয়েক সেকেন্ডের সমন্বয়হীনতাই ট্র্যাজেডির মূল কারণ।”
তদন্ত ও উদ্ধারকাজে পরবর্তী পদক্ষেপ এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং দায় কার—তা নিরূপণে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে দুটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি (Investigation Committee) গঠন করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে সিগন্যালিং সিস্টেমের কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল নাকি এটি মানবিক অবহেলা, তা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে, দুর্ঘটনাকবলিত রেললাইন সচল করতে এবং ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নিতে আখাউড়া থেকে একটি শক্তিশালী রিলিফ ট্রেন (Relief Train) ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেছে। লাইন ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
রেলক্রসিং নিরাপত্তা ও আধুনিকায়নের দাবি পদুয়ার বাজারের এই ঘটনা আবারও দেশের রেলক্রসিংগুলোর নিরাপত্তা ও ডিজিটাল মনিটরিং (Digital Monitoring) ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে গেটম্যানদের রিয়েল-টাইম ডাটা আদান-প্রদানের অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভবিষ্যতে এই ধরনের ‘Technical Failure’ এড়াতে রেলওয়েকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর করার দাবি জোরালো হচ্ছে।